ওজন কমাতে না খেয়ে থাকা কিংবা কঠোর ডায়েট অনুসরণের প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাবার গ্রহণ, চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা, পরিমিত আহার এবং নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পুষ্টিবিদদের মতে, খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, শাকসবজি ও স্বাস্থ্যকর চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।ওজন কমানোর জন্য অনেকেই খাবারের পরিমাণ অতিরিক্ত কমিয়ে দেন কিংবা কঠোর ব্যায়ামের মাধ্যমে দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই অভ্যাস ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর।খাদ্যতালিকায় আনুন পরিবর্তনওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনের খাবারে মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও পনিরের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। প্রোটিন তুলনামূলক দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সাদা চালের ভাতের কিছু অংশের বিকল্প হিসেবে লাল চাল, ওটস কিংবা ডালিয়া খাওয়া যেতে পারে।শাকসবজি ও সালাদে আঁশ বেশি থাকায় তুলনামূলক কম ক্যালরিতে পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া বাদাম ও অলিভ অয়েলের মতো উৎস থেকে পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে ওজন কমানোর মূল শর্ত হলো শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় মোট ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা।ওজন কমাতে মেনে চলুন পাঁচ নিয়ম১. অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলুনচা-কফিতে বাড়তি চিনি, কোমল পানীয়, আইসক্রিম এবং চিনির সিরাপযুক্ত শরবত থেকে অজান্তেই শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি প্রবেশ করতে পারে। এসব খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ কমালে ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী।২. চিনিযুক্ত ঠান্ডা পানীয় থেকে দূরে থাকুনঅনেকেই কোমল পানীয়, মিষ্টি জুস কিংবা ফ্লেভারযুক্ত পানীয় থেকে প্রচুর চিনি গ্রহণ করেন। এসব পানীয় সাধারণ খাবারের মতো তৃপ্তি না দেওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণের ঝুঁকি থাকে। তাই তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ পানি বেছে নেওয়া ভালো। তবে ঠান্ডা পানি নিজে ওজন বাড়ায় না; মূল বিষয় হলো পানীয়তে চিনির পরিমাণ।৩. থালায় রাখুন সবজি, প্রোটিন ও শর্করার ভারসাম্যখাবারের পরিমাণ ঠিক রাখতে ‘৩-২-১’ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে থালার ছয় ভাগের তিন ভাগে শাকসবজি, দুই ভাগে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং এক ভাগে ভাত, রুটি বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবার রাখা হয়। এতে খাবারের পুষ্টিগত ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হতে পারে। তবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে খাবারের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।৪. পেট ভরার সংকেত বুঝে খাওয়া বন্ধ করুনখাবার সামনে থাকলে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। এ অভ্যাস এড়াতে ধীরে ধীরে খাওয়া এবং শরীরের তৃপ্তির সংকেত খেয়াল করা জরুরি। পেট প্রায় ৮০ শতাংশ ভরা মনে হলে খাওয়া থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এতে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সহায়তা মিলতে পারে। তবে সবার ক্ষুধা ও খাবারের চাহিদা এক নয়; তাই শরীরের প্রয়োজন উপেক্ষা করে খাবার কমানো উচিত নয়।৫. খাবারের পর হাঁটার অভ্যাস গড়ুনখাওয়ার পর হালকা হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। খাবারের পর সুবিধাজনক সময়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি সক্ষমতা অনুযায়ী কাফ রেইজিং এবং চেয়ার থেকে বসা-ওঠার মতো সহজ ব্যায়াম করা যায়। এসব ব্যায়াম পায়ের পেশি সক্রিয় রাখতে ও দৈনিক শারীরিক কার্যক্রম বাড়াতে সহায়ক।দ্রুত নয়, ধীরে ওজন কমানোই ভালোওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনো একটি খাবার বাদ দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট ব্যায়ামের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাবার এবং পরিমিত ক্যালরি গ্রহণ—সবকিছু মিলিয়েই দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।মনে রাখতে হবে, শুধু নির্দিষ্ট কোনো খাবার খেলেই মেদ ঝরে না। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন পরিশ্রম অনুযায়ী ওজন কমার গতি ভিন্ন হতে পারে। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার চেষ্টা না করে ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।তথ্যসূত্র: যুগান্তর, লাইফস্টাইল প্রতিবেদন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ কৃতি ঠাকরের উল্লেখিত ওজন নিয়ন্ত্রণের পাঁচটি অভ্যাসের ভিত্তিতে সংবাদটি পুনর্লিখিত ও সম্পাদিত।