দেশের বাজারে আমদানি করা আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুরের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। উচ্চ শুল্ক-কর, সরবরাহব্যবস্থার সংকট এবং কাস্টমসে শুল্কায়নের জটিলতাকে ফলের বাজার অস্থির হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাজা ফলকে বিলাসবহুল পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে জরুরি নিত্যপণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা, শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং আমদানি ও সংরক্ষণব্যবস্থা সহজ করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় আমদানি করা ফলের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ট্যারিফ কমিশন। সভায় ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখার উপায় নিয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন।প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি দামট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আমদানি করা ফলের দাম বেশি। প্রতিবেদনে উল্লেখিত দামের তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো—ফলবাংলাদেশভারতপাকিস্তানআপেল২৮০–৩৮০ টাকা১৫০–২২০ টাকা১১০–১৭০ টাকামাল্টা২৪০–৩২০ টাকা১০০–১৬০ টাকা৮০–১৩০ টাকাকমলা২৫০–৩৫০ টাকা৯০–১৫০ টাকা৭০–১২০ টাকাআঙুর৩০০–৩৫০ টাকা১৩০–২০০ টাকা১০০–১৬০ টাকাদাম প্রতি কেজিতে; পরিসংখ্যানগুলো ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখিত।প্রতিবেদনে মাল্টার দাম ২৪০ থেকে ৩২০ টাকা উল্লেখ করা হলেও বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বাজারদরের সঙ্গে তুলনাও প্রতিবেদনে রয়েছে। এসব দামের পার্থক্য আমদানি ব্যয়, কর ও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রভাব পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।আমদানিতে ৯৬ থেকে ১২২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-করট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের মতো ফল আমদানিতে মোট শুল্ক-কর প্রায় ৯৬ দশমিক ১০ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে রয়েছে কাস্টমস ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও অগ্রিম কর।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও প্রবিধি বিভাগ থেকে জারি করা এক সার্কুলারে এসব ফলকে বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত ফলের বাজার সুরক্ষায় শতভাগ মার্জিন সংরক্ষণ করে আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকে আমদানি ব্যয় ও বাজারদরের ওপর চাপ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।শুল্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও কাস্টমসে শুল্কায়নের মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকাকেও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। এ ছাড়া আমদানি সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব বাজারের সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।দাম কমাতে তিন দফা সুপারিশফলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ট্যারিফ কমিশন কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা: তাজা ফল ও খেজুরকে বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে জরুরি নিত্যপণ্যের আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা।শুল্কায়ন ও খালাস সহজ করা: আন্তর্জাতিক বাজারদর ও প্রকৃত ক্রয়মূল্য বিবেচনায় শুল্কায়ন এবং পচনশীল ফল দ্রুত খালাসে গ্রিন চ্যানেলের ব্যবস্থা করা।আমদানি ও সংরক্ষণ বাড়ানো: ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র বা এলসি খোলার সুবিধা সহজ করা এবং হিমাগার সুবিধার পরিধি বাড়ানো।কমিশনের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আমদানির ব্যয় কমানো, সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভরপ্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টন আমদানি করা তাজা ফলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে আপেল ও মাল্টার চাহিদা বেশি। দেশীয় উৎপাদন সীমিত হওয়ায় আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের মতো ফলের চাহিদার প্রায় ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।পবিত্র রমজান ও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এসব ফলের বড় অংশ চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।মাল্টার দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট বাণিজ্যমন্ত্রীসভায় মাল্টার অস্বাভাবিক দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধান এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। মন্ত্রী বলেন, ‘বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না।’সভা সূত্রে জানা গেছে, খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সুপারিশ করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মাল্টা আমদানির শুল্ক কমানোর বিষয়টিও পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।সরবরাহ সংকটের কথাও বলছেন আমদানিকারকেরাসভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার দাম বাড়ার অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাঁদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে, অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার প্রয়োজন।উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলে সভায় জানানো হয়। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণেও আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে।অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি জানান, বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নে সেই পার্থক্য সব সময় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎপত্তিস্থলের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত শুল্কায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে।সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানি প্রক্রিয়ার যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।