বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক ও শ্রমিকদের কিউআর কোডসংবলিত নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধভাবে কাজ করা, প্রতারণা, কর ফাঁকি ও অর্থপাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে উদ্যোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশিদের নিবন্ধন কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।গত ২৯ আগস্ট রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ সদর দপ্তর আয়োজিত কোয়ার্টারলি কনফারেন্সে বিদেশি নাগরিকদের নিবন্ধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সম্প্রতি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।এসবির এক ডিআইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিউআর কোডসংবলিত নিবন্ধনব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। এর মাধ্যমে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। পাশাপাশি কেউ অপরাধে জড়ালে তাকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে কর্মরত বিদেশি শ্রমিক ও নাগরিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশে কত বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে পুলিশের বিশেষ শাখাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।বিদেশিদের অপরাধে জড়ানোর অভিযোগআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ভারত, চীন ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। স্ক্যামিং, অনলাইন জুয়া ও সাইবার প্রতারণার মতো অপরাধে বিদেশিদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।এর মধ্যে গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চীন ও তাইওয়ানের কয়েকজন নাগরিকের পরিচালিত সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জুয়ার কার্যক্রমের সন্ধান পায় পুলিশ। চারটি আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে সেখানে ল্যাবের আদলে এসব কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।অভিযানে চীনের ছয় নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, স্টারলিংক ডিভাইসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে তদন্তের ভিত্তিতে ২৮০ বিদেশি নাগরিকের একটি তালিকা তৈরি করে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। তাদের পাসপোর্ট ব্লক করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বিদেশি নাগরিকের সঠিক পরিসংখ্যান নেইবাংলাদেশে বর্তমানে কত বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন, তার পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা কিছুদিন আগের একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে জানান, দেশে বৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭।এর মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ভিসায় ১০ হাজার ৪৮৫, এমপ্লয়ি ভিসায় ১৪ হাজার ৩৯৯, স্টাডি ভিসায় ৬ হাজার ৮২৭ এবং ট্যুরিস্ট ভিসায় ৭৫ হাজার ৪৫৬ জন রয়েছেন।জাতীয়তা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যার সংখ্যা ৩৭ হাজার ৪৬৪। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনা নাগরিকের সংখ্যা ১১ হাজার ৪০৪।তবে ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে চার থেকে পাঁচ লাখ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে বিভিন্ন মহলে যে দাবি করা হয়, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় এ ধরনের সংখ্যা অনুমাননির্ভর।কাজের অনুমতি দেয় যেসব সংস্থাবাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি দেওয়ার দায়িত্বে আগে একাধিক সরকারি সংস্থা ছিল। বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিদেশি কোম্পানির শাখা ও লিয়াজোঁ অফিসে কাজের অনুমতি দিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা)। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), এনজিওতে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং হাইটেক পার্কে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমতি দিত।সম্প্রতি বিডা, বেজা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে নতুন দপ্তর গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতির ক্ষেত্রে এ দপ্তর দায়িত্ব পালন করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র দেয়। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ইস্যু করে।বিজনেস ও ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসে কাজ করার সুযোগ না থাকলেও অনেকে এসব ভিসায় এসে অনুমোদন ছাড়াই কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার না থাকায় তাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ২০ হাজার ৯৮৮সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বিডা থেকে ১৫ হাজার ৮৯৮ জন বিদেশি নাগরিক নতুন করে কাজের অনুমতি নিয়েছেন অথবা অনুমতি নবায়ন করেছেন। বেপজা থেকে অনুমতি নিয়েছেন ১ হাজার ৮০০-এর বেশি এবং বেজা থেকে ১ হাজার ৩৫০ জন।সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হিসাবে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা ২০ হাজার ৯৮৮ জন। তবে এ পরিসংখ্যানও সর্বশেষ হালনাগাদ নয়।কর ফাঁকি ও অর্থপাচারের অভিযোগবাংলাদেশে অবস্থান করে কাজ করলে আইন অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি নেওয়া এবং প্রযোজ্য আয়কর দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনুমোদনহীনভাবে কাজ করা এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।২০০৬ সালের ভিসা নীতিমালায় এ-থ্রি ভিসায় কাজের অনুমতি গ্রহণের শর্ত না থাকায় এ ভিসায় আসা অনেক বিদেশি কর্মী অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এতে আয়কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।এ ছাড়া কাজের অনুমতিবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে দেশ ছাড়ার সুযোগ থাকায় আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রদেয় করের তুলনায় জরিমানার পরিমাণ কম হওয়ায় অনেকে বৈধ অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।সমন্বয়হীনতায় বাড়ছে জটিলতাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিচ্ছেন অনুমতিবিহীন বিদেশি নাগরিকদের কেউ কেউ। পুরোনো পাসপোর্টের পরিবর্তে নিজ দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাস থেকে নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করে দেশত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে নতুন ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।এসবি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসান বলেন, তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর এসবিতে যোগ দিয়েছেন। বিদেশি শ্রমিকদের নিবন্ধনের বিষয়ে আগের এসবি প্রধান প্রস্তাব দিয়ে থাকতে পারেন। বিষয়টি খোঁজ নিতে হবে।তিনি আরও বলেন, ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিদেশি শ্রমিকদের কাজের অনুমোদন দেয়। এ ক্ষেত্রে বিধিবিধানের কিছু ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো পূরণে কাজ চলছে। বিদেশিদের নিবন্ধনের বিষয়টি জটিল এবং চাইলেই দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।নিবন্ধনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবেঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বিদেশি নাগরিকদের নিবন্ধনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য নিবন্ধনব্যবস্থা জরুরি। কিউআর কোডে তাদের প্রাথমিক পরিচিতি, কর্মস্থল ও অবস্থানের তথ্য সংযুক্ত করা গেলে সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে।তার মতে, এ ব্যবস্থা চালু হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধে জড়িত বিদেশিদের শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের দেশীয় সহযোগীদেরও নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।তিনি বলেন, বিদেশিরা এককভাবে সব ধরনের অপরাধে জড়াতে পারেন না; অনেক ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে দেশীয় সহযোগীরাও যুক্ত থাকেন। কার্যকর নিবন্ধন ও নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে উভয় পক্ষের অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।