কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে গুগলের প্রচলিত সার্চ ব্যবসা। বিশেষ করে এআইনির্ভর সার্চ ব্যবস্থার কারণে বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের শেয়ারবাজারে। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য কমেছে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা।অ্যালফাবেটের প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা ফিলিপ শিন্ডলার জানিয়েছেন, গুগলের ‘এআই মোড’ প্রচলিত সার্চের বিজ্ঞাপন আয়ে প্রভাব ফেলছে। এই ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীরা কথোপকথনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন। ফলে প্রচলিত সার্চ ফলাফলের পাশে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমছে।তবে এআইনির্ভর সার্চ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী শিন্ডলার। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে গুগলের অগ্রগতির গতিপথ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট।নিজের ব্যবসাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে গুগলএআই প্রযুক্তির উত্থানে তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুগলের দীর্ঘদিনের আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বর্তমানে লাখ লাখ মানুষ তথ্য অনুসন্ধান ও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পেতে চ্যাটজিপিটি ও ক্লডের মতো এআইভিত্তিক সেবা ব্যবহার করছেন।গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসার সাবেক প্রধান কিম স্কট বিবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গুগলের প্রচলিত ব্যবসার বাজার দখল করার আগেই নিজেদের এআই প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।তার মতে, প্রতিযোগীদের হাতে বাজার হারানোর চেয়ে নিজেদের নতুন প্রযুক্তি চালু করে প্রচলিত ব্যবসায় প্রভাব পড়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত গুগল।তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েই গুগলের প্রতিষ্ঠা। এ ধরনের বিনিয়োগ স্বল্প মেয়াদে ব্যবসায় চাপ তৈরি করলেও দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে।আয় বেড়েছে, তবু বিনিয়োগকারীদের হতাশাগত বুধবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে অ্যালফাবেট জানায়, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—তিন মাসে তাদের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ১২ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস পূরণ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন ব্যবসার আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম ১২ শতাংশের বেশি কমে ছয় মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। আগের দিন প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ছিল ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি ডলার। বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি ডলারে।গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেস্টারের প্রধান বিশ্লেষক ট্রেসি উ বলেন, গুগলের সার্চ ব্যবসার ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের অর্থ জোগানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার শক্তি ধরে রাখা কতটা কঠিন।এআই বিনিয়োগে চাপে অ্যামাজনওএআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়েছে মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনও। তবে এ বিনিয়োগের কারণে প্রচলিত ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও নগদ অর্থের প্রবাহে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা।অ্যামাজন জানিয়েছে, তাদের ত্রৈমাসিক আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির অবাধ নগদ অর্থের প্রবাহ ঋণাত্মক ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারে নেমেছে। তিন মাসের ব্যবধানে এ ব্যয় ছয় গুণ বেড়েছে। বৃহস্পতিবার লেনদেনের পর অ্যামাজনের শেয়ারের দামও ৬ শতাংশ কমে যায়।প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি বলেন, ক্লাউড সেবা ও খুচরা বিক্রির ব্যবসা ভবিষ্যতে অ্যামাজনের জন্য এক ট্রিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।এ ছাড়া নিজস্ব কম্পিউটার চিপ তৈরি ও বিক্রি এবং এআই ডেভেলপার প্ল্যাটফর্ম ‘বেডরক’-এর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বেডরকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন বড় এআই মডেল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পান।জ্যাসির মতে, প্রযুক্তির জগতে একটিমাত্র প্রযুক্তি দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এআই খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এ ব্যয়ের অর্থ জোগাতে সক্ষম এবং দীর্ঘ মেয়াদে এসব বিনিয়োগ অ্যামাজনের ব্যবসা, আয় ও অবাধ নগদ অর্থের প্রবাহে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে।এআইয়ের প্রকৃত আর্থিক সুফল নিয়ে প্রশ্নঅন্যদিকে, মাইক্রোসফটের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের পর শেয়ারবাজারে তুলনামূলক কম প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ১ শতাংশেরও কম কমেছে।মাইক্রোসফটের গত ত্রৈমাসিক আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ২৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ক্লাউড ব্যবসার আয় ৩০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা জানান, এআই চ্যাটবট ও প্রযুক্তি সহায়ক টুল ‘কোপাইলট’-এর ব্যবহার বেড়েছে। জুলাই থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়া কাজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৫০০ শতাংশ বেড়েছে।তবে ফরেস্টারের বিশ্লেষক ট্রেসি উ মনে করেন, এআই প্রযুক্তির চাহিদা শক্তিশালী হলেও এ খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রকৃত আর্থিক সুফল শেষ পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠান পাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা হিসাব-নিকাশ করছেন।তার মতে, প্রযুক্তি খাতের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো—এআইয়ের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে জমা হবে?