ছয় সন্তানকে জীবনের সবটুকু শ্রম ও সামর্থ্য দিয়ে বড় করেছেন ৯৫ বছর বয়সী হাজী শামসুল হক মোল্লা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের কাছেই এখন তিনি বোঝা। জমিজমা ভাগ করে দেওয়ার পর ঠাঁই হয়নি কোনো সন্তানের ঘরে। শেষ পর্যন্ত বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচেই আশ্রয় নিতে হয়েছে এই বৃদ্ধ বাবাকে।মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।হাজী শামসুল হক মোল্লা ওই গ্রামের ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে। তাঁর দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। চার মেয়ের মধ্যে মায়া, সাবিনা ও সালমা বিবাহিত। ছোট মেয়ে কাজুলী শারীরিক প্রতিবন্ধী।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে জমি বিক্রি করে হজ পালন করেন শামসুল হক। এ সময় অবশিষ্ট জমিজমাও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। চার মেয়েকে জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকা করে দেন। আর দুই ছেলেকে নগদ অর্থের পাশাপাশি আট কাঠা করে জমি দেন বলে জানিয়েছেন তাঁর মেজো মেয়ে সাবিনা বেগম।তবে বর্তমানে বিপত্নীক এই বৃদ্ধের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না সন্তানদের কেউ। গত কয়েক দিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে মায়া বেগম তাঁকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান। অভিযোগ, সেখানে দুই ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীরা মিলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পাশের একটি গাছের নিচে রেখে যান।বাবাকে নিজের বাড়িতে রাখতে না পারার কারণ হিসেবে মায়া বেগম বলেন, তাঁর স্বামী অসুস্থ। এ ছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলীও তাঁর বাড়িতে থাকেন। এ অবস্থায় বাবার দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।মেজো মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, চার বোনকে বাবা জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকা করে দিয়েছেন। দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দিয়েছেন। এখন বোনেরা কেন বাবার দেখাশোনা করবেন—এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পাওয়া যায়নি। তাঁদের স্ত্রীরাও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাশের বাড়ির এক গৃহিণী বলেন, শামসুল হক মোল্লার জমিজমা লিখে নেওয়ার পরও সন্তানরা তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছেন না। তিনি সন্তানদের জমি লিখে না দিলে হয়তো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। কোনো বাবার সঙ্গে এমন আচরণ কাম্য নয়।নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বৃদ্ধ শামসুল হক বলেন, ‘আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারাজীবন কষ্ট করে যাদের বড় করলাম, তাদের কাছেই আমি এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি।’ঘটনার বিষয়ে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন এবং ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। সন্তানরা বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।