জঙ্গল কেটে জনপদ, ইতিহাসের সাক্ষী লক্ষ্মীপুরের তিতাখাঁ ও মিতাখাঁ মসজিদএকসময় চারদিকে ছিল ঘন জঙ্গল। দুর্গম সেই অরণ্যের ভেতরে ছিল পাশাপাশি দুটি প্রাচীন ইবাদতখানা। একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব মাত্র ৫০ মিটার। কালের পরিক্রমায় জঙ্গল উজাড় হয়ে গড়ে উঠেছে জনপদ, বেড়েছে মানুষের বসতি। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক তিতাখাঁ জামে মসজিদ ও হযরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিক কারুকাজ ও নানা লোককথা ঘিরে মসজিদ দুটি এখন লক্ষ্মীপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন।লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে দক্ষিণে চকবাজার সড়কের বাঞ্চানগর এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ দুটি। এর মধ্যে দ্বিতীয় মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে মিতাখাঁ মসজিদ কিংবা দায়রা মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদ দুটির সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, মোগল আমলে প্রায় ৫০০ বছর আগে এগুলো নির্মিত হয়েছিল।তিতাখাঁ মসজিদের দেয়ালে প্রাচীন কারুকাজতিতাখাঁ জামে মসজিদটি উত্তর তেমুহনীর দায়রা বাড়ির পাশে ইসলাম বক্স ভূঁঞা বাড়ির সামনে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১২২৯ হিজরি সনে ঘন জঙ্গলের মধ্যে মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়।মসজিদটির নামকরণের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা না গেলেও স্থানীয়দের মধ্যে নানা মত প্রচলিত রয়েছে। কারও ধারণা, তিতাখাঁ নামে কোনো ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিলেন। আবার স্থানীয়ভাবে শোনা যায়, সে সময় ওমর আলী নামে এক কারিগর মসজিদটির নান্দনিক কারুকাজ করেছিলেন।ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত একতলা মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৯ ফুট এবং প্রস্থ ৪২ ফুট। চার কোণে রয়েছে চারটি ছোট মিনার, ছাদে রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ। তবে স্থাপনাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক দেয়ালের কারুকাজ। লতাপাতা ও বিভিন্ন শৈল্পিক নকশার পাশাপাশি দেয়ালের ভেতরে ও বাইরের অলংকরণে ব্যবহার করা হয়েছে ভাঙা সিরামিকের টুকরো।দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে স্থাপত্যের কিছু পুরোনো বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেলেও মসজিদটি এখনো তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বর্তমানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কয়েকশ মুসল্লি অংশ নেন। মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মসজিদটিতে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, মোগল শাসনামলে পাঠান পরিবারের তিতাখাঁ নামে এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। প্রাচীন এই স্থাপনার প্রতি মানুষের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই এর স্থাপত্যশৈলী ও কারুকাজ দেখতে আসেন। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে।মিতাখাঁ মসজিদ ঘিরে বাঘের লোককথাতিতাখাঁ মসজিদ থেকে মাত্র ৫০ মিটার উত্তরে অবস্থিত আরেকটি প্রাচীন স্থাপনা হযরত আজিম শাহ জামে মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি মিতাখাঁ মসজিদ ও দায়রা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক বর্ণনা ও লোককথা।প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৫ সালে ইয়েমেন থেকে পীর দায়েম শাহের নির্দেশে লক্ষ্মীপুরে আসেন আজিম শাহ (রহ.)। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৬ বছর। লক্ষ্মীপুরে এসে তিনি প্রবেশ করেন ঘন জঙ্গলে। দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি ফিরে না আসায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ, ওই জঙ্গলে তখন বাঘসহ বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীর বিচরণ ছিল।