আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং ঝরে পড়া রোধের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখনফল, মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি, পুষ্টি, শিক্ষক উন্নয়ন, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের এককভাবে দায়ী না করে সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিকে উত্তরণের সময় এ হার আরও বাড়ে। কোনো শিশু যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্য অর্জনে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রাখাও এ কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।খাবারের মান নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারের উদ্যোগবিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পুষ্টিমান বিবেচনায় খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে খাবার সংরক্ষণের জন্য স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।খাবারের মান নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানোর নির্দেশনা দেন তিনি। গুজব কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে মায়েদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন ববি হাজ্জাজ। তিনি জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মায়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে খাবার প্রস্তুত ও বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষিত মায়েরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ডিম সিদ্ধ, সংরক্ষণ ও বিদ্যালয়ে সরবরাহের কাজে অংশ নিতে পারেন। এতে খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের অংশগ্রহণও বাড়বে।অবকাঠামো উন্নয়নে মান নিশ্চিতের তাগিদপ্রাথমিক উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে যথাযথ তদারকি এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের কারণে নতুন অবকাঠামো যেন দ্রুত নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে হবে।বিদ্যালয়ের উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি প্রধান শিক্ষকদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মসজিদ ও মন্দির কমিটি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন। বিদ্যালয়ের প্রতি স্থানীয় মানুষের মালিকানাবোধ তৈরি হলে অবকাঠামো সংরক্ষণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।সভায় সভাপতিত্ব করেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উড, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক এবং বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ সময় উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী বাহুবল উপজেলার বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দারাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। সেখানে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম, খাবারের গুণগত মান, সংরক্ষণ ও পরিবেশনব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণের খোঁজখবর নেন।