হাঁটার গতি শুধু শারীরিক সক্ষমতার পরিচায়ক নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তুলনামূলক দ্রুত হাঁটেন, তাদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ধীরগতিতে হাঁটা ব্যক্তিদের তুলনায় কম। গবেষণায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট দূরত্ব হাঁটার গতি এবং দৈনন্দিন জীবনের হাঁটার গতি—দুই পদ্ধতিকেই মৃত্যুঝুঁকি নিরূপণের কার্যকর সূচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।গত ২৩ অক্টোবর চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, হাঁটার গতি পরিমাপের উভয় পদ্ধতিই মৃত্যুঝুঁকি অনুমানের ক্ষেত্রে প্রায় সমান কার্যকর।১২ বছর ধরে পর্যবেক্ষণযুক্তরাজ্যের হোয়াইটহল-২ গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত এ গবেষণায় অংশ নেন ৪ হাজার ৬৭ জন। তাঁদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৬৯ বছর। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন নারী।২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও মৃত্যুর তথ্য পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে স্বাভাবিক গতিতে ২ দশমিক ৪৪ মিটার দূরত্ব হাঁটতে দেওয়া হয়। এ পরীক্ষা তিনবার নেওয়ার পর গড় হাঁটার গতি নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি দৈনন্দিন হাঁটার গতি পরিমাপের জন্য তাঁদের টানা নয় দিন হাতে বিশেষ যন্ত্র পরিয়ে রাখা হয়। ওই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতি মিনিটে পদক্ষেপের সংখ্যা এবং দৈনিক মোট পদক্ষেপ হিসাব করা হয়।দ্রুত হাঁটার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি কমার সম্পর্কপ্রায় ১২ বছরের পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৩৯ জনের মৃত্যু হয়। বয়স, জীবনযাপন ও শারীরিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও হাঁটার গতির সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়।গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় হাঁটার গতির প্রতিটি মানক বিচ্যুতি বৃদ্ধির সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি ২৩ শতাংশ কম হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, দৈনন্দিন জীবনে মধ্যম গতিতে হাঁটার ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি ১৭ শতাংশ এবং দ্রুত গতিতে হাঁটার ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।গবেষকেরা জানিয়েছেন, নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই হাঁটার গতি মৃত্যুঝুঁকি অনুমানের একটি কার্যকর সূচক।হাঁটার গতি কমে গেলে সতর্ক হোনবিশেষজ্ঞদের মতে, হাঁটার জন্য হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, পেশি ও মস্তিষ্কের সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। ফলে আগের তুলনায় হাঁটার গতি কমে যাওয়া পেশির দুর্বলতা, ব্যথা, ভারসাম্যহীনতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।হাঁটার সময় হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, নতুন কোনো ব্যথা কিংবা চলাফেরায় সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।প্রতিদিন ১০ হাজার পদক্ষেপ কি জরুরি?শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার পদক্ষেপ হাঁটতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনিক ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার পদক্ষেপও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।তবে একবারে বেশি হাঁটার চেষ্টা না করে নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে পদক্ষেপের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। হাঁটার ভারসাম্য, পেশির শক্তি কিংবা চলাফেরায় সমস্যা থাকলে ফিজিওথেরাপি সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ব্যায়ামের আগে ও পরে পেশি প্রসারণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু দ্রুত হাঁটলেই আয়ু বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে দৈনন্দিন জীবনে হাঁটার গতি আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিতে পারে।তথ্যসূত্র: চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী JAMA Network Open (২৩ অক্টোবর ২০২৬) ও হেলথলাইন।