কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধে ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জাহাজ কবে এই সুবিধা পাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সীমা ঘোষণা করেনি তেহরান। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।গত মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম এ তথ্য জানান। ইরানি সংবাদমাধ্যম আইএসএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এসব দেশের জাহাজ আটকাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এ প্রণালিতে বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।ছাড়ের বিনিময়ে অর্থ ও কূটনৈতিক সুবিধাকাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও চীনের জাহাজ চলাচলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার পেছনে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ইরানি আইনপ্রণেতা।আমির হায়াত মোঘাদ্দামের দাবি, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীন থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার বিনিময়ে দেশ দুটির জাহাজ চলাচলে ছাড় দিচ্ছে তেহরান। তবে ভারত ও চীনের জাহাজকে এ সুবিধার জন্য ফি দিতে হবে।অন্যদিকে, কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। ইরাকের জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো ফি নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি তিনি।যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে নতুন চ্যালেঞ্জবিশ্লেষকদের মতে, চার দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে একদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে চায় ইরান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কার্যকারিতা দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে দেশটি।বিশেষ করে চীনের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। দেশটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে। ফলে চীনা জাহাজের চলাচল অব্যাহত থাকলে ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।তবে ইরানের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দর থেকে আসা-যাওয়া করা সব দেশের জাহাজই অবরোধের আওতায় থাকবে। তবে ইরানের বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন জাহাজের চলাচলে কোনো বাধা নেই।বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এ সিদ্ধান্ত কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপর ছাড়ের বাস্তব কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে। ভারত ও চীনের জাহাজ ইরানের বন্দরে যাতায়াতের সুযোগ পেলে মার্কিন অবরোধ বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।ছাড় থাকলেও ঝুঁকিমুক্ত নয় জাহাজ চলাচলএদিকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের অনুমতি পেলেও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। গত ৩০ অক্টোবর উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী জাহাজে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানে।আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।ফলে চার দেশের জন্য ইরানের দেওয়া বিশেষ ছাড়ের মধ্যেও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। অন্য দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কবে শিথিল হবে, সে বিষয়ে তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।