আট সপ্তাহের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ঘণ্টা আগে ঘুমাতে যাওয়ার সঙ্গে ওজন কমার সম্পর্ক রয়েছেপ্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওজন নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি ঘুমানোর সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে আগে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের সময়সূচিতে পরিবর্তন ইতিবাচক ফল দিতে পারে।গবেষণায় দেখা গেছে, আট সপ্তাহের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যারা তুলনামূলক আগে ঘুমাতে গেছেন, তাদের ওজন বেশি কমেছে। তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রার উল্লেখযোগ্য উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।যেভাবে পরিচালিত হয় গবেষণা‘নার্সিং রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ২০০ প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকেই প্রতি রাতে সাড়ে ছয় ঘণ্টার কম ঘুমাতেন।গবেষকেরা দৈবভাবে তাঁদের দুটি দলে ভাগ করেন। উভয় দলকে আট সপ্তাহের কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, শারীরিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সাপ্তাহিক ভিডিও কলের মাধ্যমে পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে একটি দলকে অতিরিক্ত ঘুমবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।এ প্রশিক্ষণে নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি বজায় রাখা, ধীরে ধীরে আগে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমের সময় বাড়ানো এবং বিছানাকে শুধু ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত রাখার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিন ঘুমের হিসাব রাখেন। গবেষণার শুরু ও শেষে রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণে ধারাবাহিক গ্লুকোজ মনিটরিং যন্ত্র এবং ঘুমের ধরন নির্ণয়ে কবজিতে পরার অ্যাক্টিগ্রাফ ব্যবহার করা হয়।ফলাফলে দেখা যায়, দুই দলেই ঘুমের মান ও ওজনের উন্নতি হয়েছে। তবে অতিরিক্ত ঘুমবিষয়ক প্রশিক্ষণ পাওয়া ব্যক্তিদের ঘুমের মান তুলনামূলক বেশি উন্নত হয় এবং দিনের বেলায় ঘুমঘুম ভাব কমে। তাঁদের ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও আগের তুলনায় এগিয়ে আসে।প্রতি ঘণ্টা আগে ঘুমালে কমতে পারে ওজনগবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ঘুমের মোট সময়ের চেয়ে কখন ঘুমাতে যাওয়া হচ্ছে, সেটিও ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।গবেষণার প্রধান লেখক ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব নার্সিংয়ের সহকারী অধ্যাপক সুসান কোল ম্যালোনের মতে, শুধু কতক্ষণ ঘুমানো হচ্ছে তা নয়, কখন ঘুমাতে যাওয়া হচ্ছে, সেটিও ওজন কমানো ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা কোন দলে ছিলেন, তা নির্বিশেষে প্রতি এক ঘণ্টা আগে ঘুমাতে যাওয়ার সঙ্গে আট সপ্তাহে প্রায় ১ দশমিক ৩ পাউন্ড বা ০ দশমিক ৫৯ কেজি ওজন কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে শুধু ঘুমের সময় বাড়ানোর সঙ্গে একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি।আগে ঘুমালে ওজন কমার সম্ভাব্য কারণগবেষকদের মতে, আগে ঘুমাতে যাওয়ার ফলে কয়েকটি শারীরবৃত্তীয় ও জীবনযাপনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে।প্রথমত, রাতে জেগে থাকার সময় কমলে অতিরিক্ত নাশতা বা অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণের প্রবণতা কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কারণ দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীরের গ্লুকোজ প্রক্রিয়াকরণ ও ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা পরিবর্তিত হয়।এ ছাড়া রাতে দীর্ঘ সময় কৃত্রিম আলোতে থাকা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের চক্র ব্যাহত করতে পারে। অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী ঘ্রেলিনসহ বিভিন্ন হরমোনের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ঘুমের ঘাটতিতে কর্টিসলের মতো মানসিক চাপের হরমোনের মাত্রা বেড়ে ক্ষুধা ও ইনসুলিন প্রতিরোধের সমস্যা তৈরি হতে পারে।প্রি-ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ঘুমই একমাত্র সমাধান নয়গবেষণার ফলাফলে আগে ঘুমাতে যাওয়ার সঙ্গে ওজন কমার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও রক্তে শর্করার মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাই ঘুমের সময় এগিয়ে আনাকে প্রি-ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি। এর পাশাপাশি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এবং রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করা সহায়ক হতে পারে।