ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে বন্দি হাবিবার জীবন, আর পুরোনো বাড়ির উঠানে মাটির টানে বেঁচে থাকা ইয়াসিন-কুলসুম দম্পতিচার ইউনিটের আটতলা একটি ভবন। সেখানে ৩২টি পরিবারের বসবাস। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় আকাশের বুকে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি গ্রাম। অথচ একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করেও বাসিন্দাদের মধ্যে নেই তেমন পরিচয় কিংবা আন্তরিকতা। দেখা হলে সৌজন্য বিনিময়—‘কেমন আছেন?’ ‘ভালো আছি।’ কখনো সেইটুকুও হয় না।ভবনটির পাঁচতলার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন হাবিবা। অনেক ভেবেচিন্তে আড়াই লাখ টাকা বেশি দিয়ে দক্ষিণমুখী ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল খোলামেলা পরিবেশে দখিনা বাতাস উপভোগ করা। কিন্তু এখন মনে হয়, সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। জানালা খুললেই বাতাসের সঙ্গে ঘরে ঢোকে ধুলাবালি। সঙ্গে গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার আর রাস্তাঘাটের কোলাহল। জানালা বন্ধ করেও পুরোপুরি মুক্তি মেলে না এসব শব্দ থেকে।তাই খুব প্রয়োজন না হলে দক্ষিণের জানালা খোলেন না হাবিবা। বিকেলের চা খাওয়ার জন্য পশ্চিমের বারান্দায় বসেন। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। সরু বারান্দায় চেয়ার পেতে বসার উপায় নেই। ছোট্ট একটি মোড়ায় বসে কোনোমতে চা খেতে হয়। পা ছড়িয়ে বসারও সুযোগ নেই। সামনে তাকাতে ঘাড় ঘুরিয়ে রাখতে হয়। কিছুক্ষণ পর অস্বস্তিতে উঠে দাঁড়াতে হয় তাঁকে।ফ্ল্যাট কেনার পর নিজেদের একটি বাড়ি হয়েছে—এই আনন্দে একসময় বুক ভরে উঠেছিল হাবিবার। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, সেই আনন্দ ততই ফিকে হয়েছে।নিজের ফ্ল্যাটে বসবাস করতেও নিয়মিত গুনতে হয় নানা খরচ। লিফটের বিল, দারোয়ানের বেতন, সিঁড়ি পরিষ্কারের খরচ—সবকিছুর জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়। কিছুদিন আগে চারতলার একটি ফ্ল্যাটে চুরিও হয়েছে। ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তাকর্মী থাকার পরও ঠেকানো যায়নি চুরি।মেয়ে বড় হয়েছে। সম্প্রতি তার জন্য একটি আলমারি কেনা হয়েছে। আগে ঘরে ছিল একটি খাট ও ছোট্ট একটি ওয়্যারড্রোব। আলমারি বসানোর পর মেয়ের ঘরে জায়গার সংকট আরও বেড়েছে। মেয়ের অভিযোগ, এখন ঠিকমতো জায়নামাজ বিছানোর জায়গাটুকুও নেই।এক বিকেলে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় এসে বসেন হাবিবা। ফাল্গুন প্রায় শেষ। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। তিনটি বাড়ি পরের একটি জামগাছ থেকে ভেসে আসছে সেই ডাক। আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু গাছপালাও যেন বসন্তের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।কিন্তু সেই অনুভূতিও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মাত্র নয় মাসেই বারান্দার দেয়ালে নোনা ধরেছে। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন হাবিবা।পুরোনো বাড়ির ছাদে অন্য এক জীবনহাবিবার ফ্ল্যাট থেকে নিচে তাকালেই চোখে পড়ে একতলা একটি পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির ছাদজুড়ে নানা রকম গাছপালা, লতাপাতা ও সবজির আবাদ। এক বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা মিলে ছোট্ট ছাদটিকে যেন সবুজ বাগানে পরিণত করেছেন।ছাদে কলাগাছ দেখে প্রথমে অবাক হয়েছিলেন হাবিবা। একটি ড্রামে শজনে, অন্যটিতে মেহেদিগাছ। মৌসুম শেষ হলেই নতুন ফসলের প্রস্তুতি নেন তাঁরা। বৃদ্ধ দম্পতির গাছের পরিচর্যা, পানি দেওয়া, সবজি তোলা কিংবা ফল সংগ্রহের দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে হাবিবার।বাড়িটির বৃদ্ধার নাম কুলসুম বেগম। তাঁর স্বামী ইয়াসিন আলী ভালোবেসে তাঁকে ‘কুসুম’ বলে ডাকেন। তাঁদের দুই ছেলে। ছোট ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের অরিগন অঙ্গরাজ্যে থাকেন। তিনি এখন যমজ ছেলের বাবা। সেখানে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালোই আছেন। দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন বৃদ্ধ দম্পতি।বড় ছেলে ঢাকায় থাকেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের মহাখালী শাখার দায়িত্বে আছেন। দূরে থাকলেও নিয়মিত বাবা-মায়ের খোঁজখবর রাখেন।একদিন বাগান থেকে সাতটি পাকা টমেটো তুলে স্বামীর কাছে নিয়ে গেলেন কুলসুম বেগম। আগের দিন তুলেছিলেন ছয়টি। আনন্দের সঙ্গে বললেন, এ বছর তাঁদের এক কেজি টমেটোও কিনতে হয়নি। টমেটো কেনার পুরো টাকাটাই বেঁচে গেছে।ইয়াসিন আলী মজা করে বললেন, টমেটোর টাকা বাঁচানো বড় কথা নয়, কুলসুমই তাঁর জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন। কুলসুম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, জীবন বাঁচানোর মালিক একমাত্র আল্লাহ।কথা বলতে বলতে হঠাৎ পাঁচতলার বারান্দায় চা হাতে বসে থাকা হাবিবাকে দেখতে পেলেন কুলসুম। প্রায় প্রতিদিনই পরিপাটি শাড়ি পরে বিকেলে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসেন হাবিবা।কুলসুম স্বামীকে বিষয়টি দেখালে ইয়াসিন আলী রসিকতা করে বলেন, এই বয়সে আর দেখে কী হবে? যখন দেখার ইচ্ছা ছিল, তখন তো ডানে-বাঁয়ে তাকাতেও দিতে না।পুরোনো দাম্পত্যের খুনসুটিতে কিছুক্ষণ হাসাহাসি করেন তাঁরা।নিজের বাড়ি, তবু নেই স্বস্তিইয়াসিন আলী ও কুলসুম বেগমের নিজেদের বাড়িটি অবশ্য খুব একটা আরামদায়ক নয়। বাড়িটির তিন দিকেই উঁচু ভবন। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় আলো-বাতাস ঢুকতে পারে না। বাড়িটি সারা বছর স্যাঁতসেঁতে থাকে। বর্ষায় সামনের রাস্তায় পানি জমে যায়। আসবাবপত্রও বেশিদিন ভালো থাকে না।তবু বাড়িটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাবে মন সায় দেয় না ইয়াসিন আলীর। ডেভেলপাররা আগ্রহী হলেও পৈতৃক বাড়ির স্মৃতি তাঁকে আটকে রাখে। পূর্বপুরুষের ভিটায় অচেনা মানুষের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার বিষয়টিও তাঁকে কষ্ট দেয়।মাঝেমধ্যে ভাবেন, নিজের উদ্যোগে বাড়িটি ডুপ্লেক্সের মতো করে সাজাতে পারলে ভালো হতো। কুলসুমেরও একটি সুন্দর বাড়ির স্বপ্ন পূরণ হতো। কিন্তু সেই সামর্থ্য আর নেই।জমানো অর্থ বলতে তেমন কিছু নেই। গ্রামের সামান্য কৃষিজমিই এখন তাঁদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। ছেলেদেরও আর্থিক অবস্থা খুব স্বচ্ছল নয়। বড় ছেলে বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে উত্তরায় প্রায় কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট কিনেছেন। ছোট ছেলেরও বিদেশে সংসার চালাতে যথেষ্ট খরচ হয়।তাই নিজেদের বাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন আপাতত স্বপ্নই থেকে গেছে।কুলসুম বেগম সবই জানেন, বোঝেন। তবু মাঝেমধ্যে তাঁর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আর ইয়াসিন আলী সান্ত্বনা দেন—বাঁচবই বা আর কত দিন!শহরের একদিকে আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটে থেকেও হাবিবা খুঁজে ফেরেন নিজের মতো একটু খোলা জায়গা। অন্যদিকে পুরোনো বাড়ির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইয়াসিন ও কুলসুম আঁকড়ে ধরে আছেন নিজেদের উঠান, ছাদ আর স্মৃতিকে।দুটি বাড়ি, দুটি জীবন। একটির আছে আধুনিক নাগরিক সুবিধা, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জায়গা ও স্বস্তি। অন্যটির আছে মাটির টান ও আপন ঠিকানা, কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য।নগরজীবনের এই বাস্তবতায় বাড়ি আর ফ্ল্যাটের পার্থক্য শুধু ইট-পাথরের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি, সম্পর্ক ও একটুখানি নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।