অভিশংসনে ক্ষমতাচ্যুত পেনিয়া গৃহবন্দি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধানের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাব্যাংক কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ক্ষমতা হারিয়েছেন প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া। অভিশংসন প্রক্রিয়ায় সিনেটের ভোটে অপসারিত হওয়ার পর শুক্রবার দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা। অন্যদিকে বিশ্বাসভঙ্গসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার সন্দেহে পেনিয়াকে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলিরা।৫২ বছর বয়সি পেদ্রো আলিয়ানা প্যারাগুয়ের ৫৩তম প্রেসিডেন্ট। ২০২৩ সালে সান্তিয়াগো পেনিয়া প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।শুক্রবার দিনের শুরুতে দেশটির ৪৫ সদস্যের সিনেটের ৪৪ জন সদস্য পেনিয়াকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেন। একজন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। এর মধ্য দিয়ে আকস্মিকভাবে শেষ হয় পেনিয়ার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ।ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পেনিয়া লেখেন, ‘কৃতজ্ঞতা নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। একই সঙ্গে স্বীকার করছি, যারা এখনো জবাবের অপেক্ষায় আছেন, তাদের যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারছি।’উয়েনো ব্যাংকের পতন ঘিরে সংকটদীর্ঘদিন ধরে প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে প্রভাবশালী রক্ষণশীল দল কলোরাডো পার্টির সদস্য পেনিয়ার ক্ষমতাচ্যুতিকে দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংকের আকস্মিক পতনকে কেন্দ্র করে চলতি সপ্তাহে রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয়। ব্যাংকটির কার্যক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোর যথাযথ নজরদারি ছিল কি না এবং এর সঙ্গে পেনিয়ার স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।গত মঙ্গলবার প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উয়েনো ব্যাংক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। ব্যাংকটির ঋণ ও অন্যান্য দায়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পদ নেই বলে জানানো হয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় ব্যাংকটির অবশিষ্ট সম্পদ অন্য ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করা হয়।তবে এ ঘটনায় উয়েনো ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক হঠাৎ করে নিজেদের ব্যাংক হিসাবের অর্থ ও পেনশনের টাকা ব্যবহারের সুযোগ হারান।ব্যাংকটির গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ, যা প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে এটি দেশটির অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। ২০২৩ সালে ‘উয়েনো’ নামে একীভূত হওয়ার পর ব্যাংকটির ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হয়। আমানতের হিসাবে একপর্যায়ে এটি প্যারাগুয়ের পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংকে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধিতে সরকারি তহবিলের ৮০ কোটি ডলারের ভূমিকা ছিল।পেনিয়ার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ২০২৩ সালে উয়েনো ব্যাংকের মূল প্রতিষ্ঠানের একজন শেয়ারধারী হিসেবে পেনিয়ার নাম সামনে আসে। তবে তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তিনি নিজের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।ব্যাংকটির পতনের পর পেনিয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার দেশটির কংগ্রেস তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ না করে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে তাঁর নিজ দল কলোরাডো পার্টিও সমর্থন দেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে দলটি প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছে।দলটির নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেস এক বিবৃতিতে বলেন, প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য তাঁরা পেনিয়ার অভিশংসনকে সমর্থন করছেন।পেনিয়াকে পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হলে সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিনেটের সদস্য হওয়ার অধিকার ধরে রাখতে পারতেন। একই সঙ্গে বিচারিক দায়মুক্তির সুবিধাও পেতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাবের পক্ষে ৭৮টি ভোট পড়ে। বিপক্ষে কোনো ভোট পড়েনি। এর ফলে পরদিন সিনেটে পেনিয়াকে অপসারণের পথ তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানার বিরুদ্ধে অভিশংসন শুনানি শুরুর প্রস্তাব নাকচ করা হয়।নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে বড় চ্যালেঞ্জপ্যারাগুয়ের দক্ষিণাঞ্চলের নেমবুকু এলাকায় গভর্নর হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন আলিয়ানা। পরে প্রায় এক দশক প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। এ সময় তিন বছর পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির মধ্যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন আলিয়ানা। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে উয়েনো ব্যাংক কোনো ধরনের জবাবদিহি এড়িয়ে যেতে পেরেছিল কি না। ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিলের প্রায় ৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল।এ ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ব্যাংকটির প্রধান শেয়ারধারী মিগেল ভাসকেজও রয়েছেন। তদন্তে জালিয়াতির চেষ্টা, বিশ্বাসভঙ্গ, তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।তদন্তে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন পেনিয়া। তবে শুক্রবারের অভিশংসন শুনানিতে তিনি নিজে উপস্থিত হননি; তাঁর পক্ষে আইনজীবীরা অংশ নেন। এক বিবৃতিতে পেনিয়া বলেন, তাঁর উপস্থিতি যেন আরও বিভক্তি বা অস্থিতিশীলতার কারণ না হয়, তা তিনি চান না। ব্যক্তিগত পরিণতির চেয়ে দেশকে প্রাধান্য দেওয়াই তাঁর দায়িত্ব।এর আগে সিনেটে দ্রুতগতিতে অভিশংসন শুনানি পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন পেনিয়া। আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য শুনানির সময় বাড়ানোর আবেদনও করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বরাদ্দ সময় স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত।তথ্যসূত্র: আলজাজিরা; রয়টার্স।