কিছু ভ্রমণ শেষ হয়, কিন্তু তার স্মৃতি কখনো ফুরায় না। সময়ের সঙ্গে ছবিগুলো পুরোনো হয়, যাত্রার স্মারক হারিয়ে যায়; তবু মনের গভীরে কিছু মুহূর্ত অমলিন থেকে যায়। ব্যস্ত জীবনের কোনো এক অবসরে হঠাৎ সেই স্মৃতি ফিরে এসে মনকে নিয়ে যায় দূর কোনো পাহাড়ে, মেঘের রাজ্যে।মালয়েশিয়ার গেনথিং হাইল্যান্ডে পরিবারের সঙ্গে কাটানো একটি দিন আমার কাছে তেমনই এক স্মৃতি। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও তিন মেয়ে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাদের আনন্দ, বিস্ময় আর হাসিমুখ পুরো ভ্রমণকে করে তুলেছিল বিশেষ।কেব্ল কারে মেঘের দেশেকুয়ালালামপুর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম পাহাড়ের পাদদেশে। সেখান থেকে শুরু হলো গেনথিং হাইল্যান্ডের মূল আকর্ষণ—কেব্ল কারে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার যাত্রা।আওয়ানা স্কাইওয়ের কাচঘেরা ক্যাবিনে বসতেই মনে হলো, পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করছি। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল ক্যাবিন। নিচে বিস্তৃত সবুজ বৃষ্টিবন, সারি সারি পাহাড় আর গাছের মাথায় প্রকৃতির সবুজ চাদর।কিছুদূর যেতেই চারপাশ ঢেকে গেল সাদা মেঘে। জানালার কাচে জমতে লাগল জলীয় বাষ্প। মনে হচ্ছিল, মেঘ যেন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে আমাদের।মেয়েরা বিস্ময়ে বলে উঠল, ‘বাবা, দেখো, আমরা মেঘের ভেতরে!’ তাদের চোখেমুখের আনন্দ দেখে মনে হলো, এত দূরের পথ পাড়ি দেওয়ার সার্থকতা যেন এই একটি মুহূর্তেই।আওয়ানা স্কাইওয়ে চালু হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬৪২ মিটার। যাত্রাপথে প্রায় ৬৩০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়। সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট। কিছু ক্যাবিনের মেঝে কাচের তৈরি। ফলে নিচের গভীর সবুজ বনভূমি দেখা যায় সরাসরি পায়ের নিচ থেকে। ভয় আর বিস্ময়ের মিশ্র অনুভূতিতে মেয়েরা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরেছিল। আর আমার স্ত্রী মুগ্ধ চোখে উপভোগ করছিলেন পুরো দৃশ্য।পাহাড়ের চূড়ায় অন্য এক পৃথিবীকেব্ল কার থেকে নেমে মনে হলো, পাহাড়ের মাথায় যেন গড়ে উঠেছে আলাদা এক শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গেনথিং হাইল্যান্ডের আবহাওয়া নিচের কুয়ালালামপুরের তুলনায় অনেক শীতল।গায়ে হালকা জ্যাকেট জড়িয়ে বুকভরে নিলাম পাহাড়ি বাতাস। চারপাশে শপিংমল, রেস্তোরাঁ, হোটেল ও থিম পার্ক। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর পুরো এলাকা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরছেন, আবার কেউ পাহাড়ি পরিবেশে সময় কাটাচ্ছেন।আমার তিন মেয়েও আনন্দে মেতে উঠল। কখনো এক জায়গায়, কখনো অন্য জায়গায় ছুটে যাচ্ছে। নতুন কিছু দেখলেই বিস্ময়ে থেমে যাচ্ছে। তাদের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, ভ্রমণের প্রকৃত সার্থকতা আসলে প্রিয়জনদের সঙ্গে এমন মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ায়।কুয়াশা যখন পাহাড়ের শহরটিকে ঢেকে ফেলে, তখন চারপাশের আলো ঝাপসা হয়ে তৈরি করে এক অপূর্ব দৃশ্য। মনে হয়, বাস্তবের কোনো শহরে নয়, রূপকথার এক জগতে এসে পড়েছি।চিন সি মন্দিরে প্রশান্তির খোঁজআওয়ানা স্কাইওয়ের মাঝপথে রয়েছে চিন সি স্টেশন। একই টিকিটে সেখানে নেমে ঘুরে দেখা যায় চিন সি ক্যাভ টেম্পল।মন্দির এলাকায় পা রাখতেই পরিবেশ বদলে গেল। চারদিকে পাহাড়, কুয়াশা আর ধূপের মৃদু গন্ধ। কোথাও মানুষ নীরবে প্রার্থনা করছেন, কোথাও পর্যটকেরা দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন পরিবেশের শান্ত সৌন্দর্য।ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রের কোলাহল থেকে বেরিয়ে এখানে এসে মনে হলো, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমার মেয়েরাও সেখানে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে চারপাশ দেখছিল।ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, এমন পরিবেশ মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকানোর সুযোগ করে দেয়। আমিও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম, প্রতিদিনের ব্যস্ততায় কত আপনজনকে সময় দেওয়া হয় না, কত কথা বলা হয়ে ওঠে না। প্রকৃতির নীরবতা যেন সেই না-বলা কথাগুলো মনে করিয়ে দিল।আলো ঝলমলে পাহাড় ছেড়ে ফেরার পালাসন্ধ্যা নামতেই পাহাড়ের চূড়ায় একে একে জ্বলে উঠল আলো। মনে হলো, আকাশের তারাগুলো নেমে এসেছে পাহাড়ের বুকে।ফেরার পথে আবারও কেব্ল কারে উঠলাম। নিচে অন্ধকার বনের ফাঁকে দূরের শহরের আলোগুলো ঝিকমিক করছিল। ক্যাবিনের ভেতর সবাই তখন নীরব। সারাদিনের আনন্দে ক্লান্ত মেয়েরা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছে। তাদের মুখে তখনো লেগে আছে আনন্দের রেশ।মনে হচ্ছিল, দিনটি যদি আরও কিছুটা দীর্ঘ হতো! যদি সময়কে একটু থামিয়ে রাখা যেত!গেনথিং হাইল্যান্ডের সেই সফর আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে, সৌন্দর্য খুঁজতে সব সময় দূরে যেতে হয় না। কখনো কখনো দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে একটু বিরতি নিলেই প্রকৃতি তার অপরূপ রূপ নিয়ে সামনে হাজির হয়। আর সেই সৌন্দর্য প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারলে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ।মেঘের ভেতর দিয়ে কেব্ল কারে ভেসে যাওয়ার অনুভূতি, পাহাড়ের শীতল বাতাস আর স্ত্রী-সন্তানদের উচ্ছ্বসিত মুখ—সব মিলিয়ে গেনথিং হাইল্যান্ড আমার জীবনের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।যাঁরা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন এবং পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য মালয়েশিয়ার গেনথিং হাইল্যান্ড হতে পারে আকর্ষণীয় ভ্রমণগন্তব্য। হয়তো মেঘের রাজ্যে গিয়ে আপনিও খুঁজে পাবেন জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্ত।ভ্রমণে যাওয়ার আগে যা জানা দরকারকেব্ল কার: আওয়ানা স্কাইওয়ে সাধারণত সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চালু থাকে। তবে ভ্রমণের আগে সময়সূচি যাচাই করা ভালো।পোশাক: পাহাড়ি আবহাওয়া শীতল ও কুয়াশাচ্ছন্ন হতে পারে। তাই সঙ্গে হালকা জ্যাকেট রাখা প্রয়োজন।টিকিট: সময় ও প্যাকেজ অনুযায়ী টিকিটের দাম পরিবর্তিত হয়। যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ মূল্য দেখে নিন।খাবার: মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। খাবার কেনার আগে হালাল সনদ বা রেস্তোরাঁর তথ্য যাচাই করা ভালো।রক্ষণাবেক্ষণ: যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণের কারণে আওয়ানা স্কাইওয়ে সাময়িক বন্ধ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প কেব্ল কার চালু আছে কি না, আগেই জেনে নেওয়া উচিত।