জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফর সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে প্রায় আটটি চুক্তি ও সমঝোতার দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে আলোচনা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি দলিল সই হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সফরকালে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোর অনেকগুলো সই হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।
ইপিএ বাস্তবায়ন ও রপ্তানি বাড়ানোর আলোচনাপ্রধানমন্ত্রীর সফরে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়া, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পাবে।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েও আলোচনা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে জাপানের শিল্প-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে পারে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সমঝোতাগুলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের শর্ত আলোচনায়ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়, অর্থায়ন ও ঋণের শর্ত নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
কম সুদে ঋণ পাওয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এসব বিষয় অবশ্যই আলোচনায় আসবে। তবে আলোচনা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চায়। বৈশ্বিক অর্থায়নব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিভিন্ন বিষয় এ ক্ষেত্রে আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা রয়েছে। ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্প ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজারে অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, স্থানীয় সরবরাহকারী ও কর্মসংস্থানের সংযোগ ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রস্তুত জমি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পূর্বানুমেয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপ্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং গুণগত মান ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক চৌধুরী।
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। এতে একদিকে বাংলাদেশি কর্মীদের উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে দেশের শিল্প খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠবে।
জাপানি বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানি ও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে স্থানীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়বে।
সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সেগুলো বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রেখে একটি কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন এই সাবেক উপাচার্য।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
সফরে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সফরসূচিতে চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা জাপান সফর করবেন। প্রতিনিধিদল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জাপান যাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায়দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব।
এ ছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ও আলোচনায় স্থান পাবে।
দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে নতুন সহযোগিতা কাঠামো তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়াই এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক