শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৩ দুপুর
  • ৩৩৩৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
লোকবিশ্বাসকে পুঁজি করে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার, প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে; চিকিৎসায় নির্ভরযোগ্য পরামর্শের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে বাড়ে যৌনক্ষমতা কিংবা জোঁকের তেলে দূর হয় জয়েন্ট ও কোমরব্যথা—বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং কথিত ঔষধি গুণের গুজবকে কেন্দ্র করে বন্যপ্রাণী শিকার, পাচার ও প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে এসব প্রাণী খাওয়া বা এগুলো থেকে তৈরি কথিত উপাদান ব্যবহার করা নিরাপদ চিকিৎসার বিকল্প নয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতন হওয়া জরুরি।

শিয়ালের মাংসে কি রোগ সারে?

দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ ভালো হয় বলে বিশ্বাস করেন কেউ কেউ। তবে এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, শিয়ালের মাংসে ঔষধি গুণ রয়েছে কিংবা এটি খেলে রোগ সারে—এমন ধারণা ভ্রান্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও জানান, শিয়ালের মাংস খেলে রোগ ভালো হয়, এমন দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। একইভাবে রাতে শিয়ালের ডাককে অমঙ্গলের লক্ষণ মনে করারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার গুজব

তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকায় বিক্রির নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর কথিত গুণের কথা বলে এ প্রাণীর উচ্চমূল্যের দাবি করা হয়। তবে এসব দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তক্ষকের চাহিদা রয়েছে—এমন বিশ্বাসের কারণে চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পাচার তক্ষকের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

জোঁকের তেল ও চিকিৎসায় জোঁকের ব্যবহার এক নয়

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিশেষ ধরনের জোঁক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে মেডিকেটেড জোঁক দিয়ে লিচ থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। তবে সব ধরনের জোঁক চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য নয়।

হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ জানান, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে রক্ত চলাচলজনিত জটিলতা ও কিছু ক্ষতের চিকিৎসায় লিচ থেরাপি ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে, জোঁকের তেল দিয়ে বাত, কোমরব্যথা কিংবা যৌনসমস্যা সারানোর দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত। তাই চিকিৎসায় নির্দিষ্ট জোঁকের ব্যবহারকে বাজারে বিক্রি হওয়া কথিত জোঁকের তেলের কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বন্যপ্রাণী শিকার ও বেচাকেনায় আইনি ঝুঁকি

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শিয়াল ও তক্ষক সংরক্ষিত প্রাণী। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, পরিবহন বা কেনাবেচা আইনবিরুদ্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান ও প্রযোজ্য অনুমতির বিষয়টি যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।

শিয়ালের মাংস বা তক্ষক খেয়ে রোগ সারানোর ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বন্যপ্রাণী খাওয়া বা অনিরাপদভাবে প্রস্তুত উপাদান ব্যবহার করলে জীবাণু কিংবা ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, রোগ নিরাময়ের নামে প্রচলিত গুজব বা অপ্রমাণিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার রোধে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad