দেশে সক্রিয় ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, ঢাকাতেই সদস্য ১,২১৯

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৫ দুপুর
  • ২৬৮৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গডফাদারদের শনাক্তে নজরদারি, প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর জোর

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫৯টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি গ্রুপ রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ২১৯ জন, যাদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নেপথ্যের হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তার ও পুলিশি অভিযান দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম, অবসর সময় কাজে লাগানোর সুযোগের অভাব এবং অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, শিক্ষা অব্যাহত রাখা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ঢাকায় বেশি তৎপরতা কয়েকটি এলাকায়

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা ধরে অভিযান চলছে। সদস্যদের পাশাপাশি মূল হোতা, মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এসব গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

ডিএমপির একটি সাম্প্রতিক তালিকার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। থানা হিসেবে পল্লবীতে ১৪টি এবং মোহাম্মদপুরে ১৬টি গ্রুপের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব গ্রুপের অবস্থান ও সক্রিয়তার চিত্র পরিবর্তনশীল।

এসআরবির এই কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ে যাচাই এবং সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো নয়, অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে পুনরায় অপরাধ সংঘটনের সুযোগ বন্ধ করাই এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য।

রাজধানীতে সদস্য ১ হাজার ২১৯

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বাসসকে বলেন, হালনাগাদ তালিকা ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অনেককে গ্রেপ্তার করে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ২১৯ জন সদস্যের তথ্য রয়েছে। তাদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছর। স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ) ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এসব অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

এডিশনাল আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান বাসসকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য কিংবা তাদের পেছনে থাকা আশ্রয়দাতা কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে শুধু গ্রেপ্তার নয়, কিশোরদের অপরাধের পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পারিবারিক দূরত্ব ও শিক্ষাজীবনে অনিয়ম ঝুঁকি বাড়ায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাসসকে বলেন, পারিবারিক নজরদারির ঘাটতি, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ, স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং অবসর সময় ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের সুযোগ না থাকা কিশোরদের অপরাধী চক্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তিনি বলেন, এলাকার বড়দের অনুসরণ, আড্ডা, মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশের মধ্য দিয়ে কোনো কোনো কিশোরের মধ্যে দলীয় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। পরে এসব সম্পর্কের সঙ্গে মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি কিংবা অস্ত্র বহনের মতো অপরাধ যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তার মতে, স্থানীয় অপরাধীরা কখনো কখনো কিশোরদের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে। বয়স কম হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম হবে—এমন ধারণা থেকেও কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ত করা হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে কাউন্সেলিং, শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ।

স্মার্টফোন ব্যবহারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে একাধিক সামাজিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করে। সন্তান নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না, কার সঙ্গে মিশছে এবং তার আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।

সন্তান মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়ছে কি না, স্কুলের বাইরে কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, সে বিষয়েও বাবা-মা ও শিক্ষকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া উচিত। অন্তত উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যায় পর্যন্ত বয়সী সন্তানদের স্মার্টফোন ব্যবহারের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি। কর্মজীবী বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে ছোট বাটন ফোনের বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মত দেন এই সমাজবিজ্ঞানী।

তিনি আরও বলেন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে স্মার্টফোনে দীর্ঘ সময় কাটানো এবং রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মানসিক বিকাশে খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক, চুলের ধরন কিংবা দলবদ্ধভাবে চলাফেরার মতো বিষয়কে এককভাবে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং আচরণগত পরিবর্তন, শিক্ষাজীবনের পরিস্থিতি ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে সহায়তা দিতে হবে।

প্রতিরোধে বিট পুলিশিং ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লায় পুলিশি নজরদারি, চিহ্নিত এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টহল পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে ইন্ধনদাতা ও তাদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্টতার মাত্রা ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মানসিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানো গেলে কিশোরদের অবসর সময় ইতিবাচক কাজে লাগানো সম্ভব হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগই এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad