মূত্রথলি কিডনি থেকে আসা প্রস্রাব জমা রাখে এবং পরে শরীর থেকে বের করে দেয়। এই অঙ্গের ভেতরের আবরণে থাকা কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে ক্যানসার তৈরি হতে পারে। রোগটি মূত্রথলির পেশি, আশপাশের টিস্যু কিংবা শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেনমূত্রথলির ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
প্রস্রাবে রক্ত: প্রস্রাবের রং গোলাপি, লালচে বা গাঢ় হতে পারে। কখনো খালি চোখে রক্ত দেখা না গেলেও পরীক্ষায় ধরা পড়ে।
ঘন ঘন প্রস্রাব: স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বার প্রস্রাবের বেগ হতে পারে।
প্রস্রাবের ধারায় পরিবর্তন: প্রস্রাব থেমে থেমে আসতে পারে।
ব্যথা বা জ্বালাপোড়া: প্রস্রাব করার সময় অস্বস্তি, ব্যথা কিংবা জ্বালাপোড়া হতে পারে।
রোগের অগ্রগতি হলে কোমর বা পিঠে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, হাড়ে ব্যথা এবং প্রস্রাব করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ মূত্রনালির সংক্রমণসহ অন্যান্য রোগেও হতে পারে। তাই শুধু উপসর্গের ভিত্তিতে ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না। বিশেষ করে প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিলে, একবার হলেও, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতেমূত্রথলির ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা না গেলেও কোষের জিনগত পরিবর্তন এ রোগের বিকাশে ভূমিকা রাখে। ধূমপান এর অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। ধূমপায়ীদের এ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় অন্তত তিন গুণ বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বয়স বৃদ্ধি, দীর্ঘদিন মূত্রথলিতে প্রদাহ বা সংক্রমণ, নির্দিষ্ট শিল্পকারখানার রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ, আগে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়া এবং পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সাধারণত ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।
সিস্টোস্কোপির মাধ্যমে ক্যামেরাযুক্ত সরু নল দিয়ে মূত্রথলির ভেতরের অবস্থা দেখা হয়। সন্দেহজনক টিস্যু পাওয়া গেলে বায়োপসির জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে। এ ছাড়া প্রস্রাব পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্ত এবং এর বিস্তার নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের পর্যায়ের ওপরমূত্রথলির ক্যানসারের ধরন, পর্যায়, রোগীর বয়স ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ভর করে। চিকিৎসায় টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে মূত্রথলির অংশবিশেষ কিংবা পুরো অঙ্গ অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ের নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিসিজি (বিসিজি) থেরাপি দেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে মূত্রথলির ভেতরে বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োগ করে শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা হয়।
চিকিৎসার পরও ক্যানসার ফিরে আসতে পারে। এ কারণে নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধে করণীয়মূত্রথলির ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধের নিশ্চয়তা নেই। তবে ধূমপান ত্যাগ, কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পানসহ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, মূত্রথলির ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। তবে ক্যানসার শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে এ হার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে আসে। এই পরিসংখ্যান রোগীর ব্যক্তিগত সুস্থতার নিশ্চয়তা নয়; রোগের পর্যায় ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসার ফল নির্ভর করে।
তাই প্রস্রাবে রক্ত, ঘন ঘন মূত্রত্যাগ কিংবা প্রস্রাবের অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক