সুন্নাহর অনুসরণ, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের মাদক থেকে রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামিক স্কলার আব্দুল হাই মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘সুন্নাহ আমলেই আমাদের মুক্তি, এখানে খাটবে না কোনো যুক্তি।’
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন তিনি। পৃথক কয়েকটি স্ট্যাটাসে শিক্ষকতার নৈতিকতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের বিচার, তরুণদের সুস্থ বিনোদন, মাদক প্রতিরোধ, মসজিদকেন্দ্রিক সামাজিক কল্যাণ এবং সম্পদের সদ্ব্যবহার নিয়েও মত তুলে ধরেন এই ইসলামিক স্কলার।
শিক্ষকতার নামে সীমালঙ্ঘনের সুযোগ নেইশিক্ষার্থীদের প্রতি শাসন, স্নেহ ও যত্নেরও সীমারেখা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সাইফুল্লাহ। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষকের ক্ষেত্রে এ নৈতিকতা আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। ‘পিতার মতো’ বা ‘বড় ভাইয়ের মতো’ পরিচয় কোনোভাবেই সীমালঙ্ঘনের বৈধতা দিতে পারে না।
তিনি বলেন, অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে তদন্তের আগেই পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়াও উচিত নয়। সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনৈতিকতা ধামাচাপা দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে অপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর ভাষ্য, ব্যক্তি, পদ কিংবা প্রতিষ্ঠানভেদে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলানো উচিত নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি আপসহীন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও মাদকমুক্ত সমাজের আহ্বানতরুণদের বিনোদনের ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাইফুল্লাহ বলেন, সাময়িক উত্তেজনা, ধূমপান ও ধীরে ধীরে নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা তরুণসমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। তরুণদের আনন্দ যেন তাদের ধ্বংসের কারণ না হয়ে সুস্থতা, নৈতিকতা ও সমাজ পরিবর্তনের প্রেরণা হয়—এমন প্রত্যাশা জানান তিনি।
সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান বন্ধ এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, মাদকমুক্ত তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা শুধু সামাজিক প্রত্যাশা নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব।
মসজিদ হোক সামাজিক কল্যাণের কেন্দ্রমসজিদকে শুধু নামাজ আদায়ের স্থান বা একটি ভবন হিসেবে না দেখে সামাজিক মিলনমেলা ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ।
মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মসজিদের দায়িত্বকে শুধু সম্মান বা পদমর্যাদার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং মসজিদকে কেন্দ্র করে আলোকিত সমাজ গঠনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নিজেরা তা বাস্তবায়নে সক্ষম না হলে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে সহযোগিতা করার পরামর্শও দেন তিনি।
সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি মানুষের উপকার জরুরিসম্পদ অর্জন ও ব্যবহারের বিষয়ে সাইফুল্লাহ বলেন, সম্পদ মানুষের হাতে থাকা উচিত, মানুষ যেন সম্পদের দাসে পরিণত না হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই সম্পদ দিয়ে কত মানুষের উপকার করা গেল এবং কতটা স্থায়ী কল্যাণ সৃষ্টি হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত সাফল্য শুধু সম্পদের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের কল্যাণে সম্পদের ব্যবহার এবং মৃত্যুর পরও সওয়াব অব্যাহত থাকে—এমন সদকায়ে জারিয়ার উদ্যোগও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষাজীবন ও কর্মপরিচয়প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল হাই মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ কুষ্টিয়ার বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। স্নাতকোত্তরে কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে স্বর্ণপদকও পান তিনি। পরে তুলনামূলক ধর্ম বিষয়ে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও উর্দু ভাষায় দক্ষ সাইফুল্লাহ তেলাওয়াতুল কোরআন প্রতিযোগিতায় তিনবার স্বর্ণপদক পেয়েছেন। তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি গবেষণারত এবং ঢাকার মাসজিদুল জুমা কমপ্লেক্সের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। টেলিভিশন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি ইসলামবিষয়ক বক্তব্য দিয়ে পরিচিতি পেয়েছেন।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক