কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা কিংবা নফল ইবাদতের সওয়াব মৃত স্বজনদের উদ্দেশে পৌঁছে দেওয়াকে ইসলামী পরিভাষায় ‘ঈসালে সওয়াব’ বলা হয়। একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির নামে সওয়াব বখশে দিলে তা ভাগ হয়ে যায়, নাকি প্রত্যেকেই পূর্ণ সওয়াব পান—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। তবে অনেক ফকিহের মতে, প্রত্যেকেই পৃথকভাবে পূর্ণ সওয়াব লাভ করেন।
মৃত বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি ও আত্মীয়স্বজনের মাগফিরাত কামনায় অনেক মুসলমান কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও নফল ইবাদত করে তার সওয়াব তাঁদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। এভাবে একাধিক মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব পাঠানোর ক্ষেত্রে ফিকাহবিদদের মধ্যে প্রধানত দুটি মত পাওয়া যায়।
আলেমদের মধ্যে দুটি মত
প্রথম মত অনুযায়ী, একাধিক ব্যক্তির উদ্দেশে সওয়াব ঈসাল করা হলে তা তাঁদের মধ্যে বণ্টিত হয়। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ও হাম্মাদ মাক্কী (রহ.)-সহ কিছু আলেমের মত হিসেবে এ অভিমত উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, একাধিক ব্যক্তির নামে সওয়াব বখশে দিলে প্রত্যেকেই পূর্ণ সওয়াব লাভ করেন। হজরত ইবনে হাজার মাক্কি (রহ.) ও আল্লামা ইবনে আবেদীন শামি (রহ.)-সহ বহু আলেম এ মতের পক্ষে মত দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ফিকাহবিদদের আলোচনায় দ্বিতীয় মতটিকে অধিক অগ্রগণ্য বলা হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, আল্লাহ তাআলার রহমত ও অনুগ্রহ অসীম। তাই একাধিক ব্যক্তিকে সওয়াব পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেককে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া তাঁর জন্য অসম্ভব নয়।
সকল মুমিনের জন্য সওয়াবের নিয়ত
ঈসালে সওয়াবের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মৃত স্বজনদের পাশাপাশি সব মুমিন নর-নারীর জন্যও নিয়ত করার পরামর্শ দিয়েছেন আলেমরা। তাঁদের মতে, এতে আমলকারীর নিজের সওয়াব কমে যায় না; বরং আল্লাহর কাছে কবুল হলে অন্যরাও এর প্রতিদান পেতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির পশু জবাই করার সময় দোয়া করেছিলেন—
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ... ثُمَّ قَالَ: بِاسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ، وَآلِ مُحَمَّدٍ، وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার এবং মুহাম্মাদের উম্মতের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৭)
এই হাদিসের আলোকে আল্লামা ইবনে আবেদীন (রহ.) নফল ইবাদত ও সদকার সওয়াব নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি সব মুমিনের জন্য উৎসর্গ করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
সওয়াব বখশানোর ক্ষেত্রে করণীয়
আলেমদের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, কেউ কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা বা নফল ইবাদতের সওয়াব একাধিক মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে উৎসর্গ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার মতটিও স্বীকৃত। তবে চূড়ান্ত প্রতিদান আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নেক আমল কবুল করুন এবং মৃত স্বজনদের মাগফিরাত দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৭।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক