বয়স কম বলে ক্যানসারের ঝুঁকি নেই—এমন ধারণা সঠিক নয়। তরুণদের শরীরেও নীরবে বাসা বাঁধতে পারে প্রাণঘাতী এ রোগ। তবে প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে সাধারণ শারীরিক সমস্যা, মানসিক চাপ কিংবা দৈনন্দিন ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করায় অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা বারবার দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা তরুণদের ক্যানসারের সম্ভাব্য নয়টি প্রাথমিক সতর্কসংকেত চিহ্নিত করেছেন। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। তবে উপসর্গগুলোর কারণ জানা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
ক্যানসার শনাক্তে দেরি হওয়ার কারণচিকিৎসকদের মতে, তরুণ বয়সে ক্যানসার শনাক্তে দেরির অন্যতম কারণ হলো রোগটির সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দেওয়া। অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি কিংবা শারীরিক অস্বস্তিকে অনেকে মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি বা ব্যস্ত জীবনযাপনের প্রভাব বলে মনে করেন।
এসব উপসর্গের পেছনে সাধারণ অসুস্থতাও থাকতে পারে। কিন্তু সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা ক্রমেই বাড়তে থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
ক্যানসারের ৯টি সতর্কসংকেতচিকিৎসকদের উল্লেখ করা সম্ভাব্য নয়টি সতর্কসংকেত হলো—
১. অকারণে ওজন কমে যাওয়া: খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় পরিবর্তন না এনেও হঠাৎ ওজন কমতে থাকা।
২. দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও দুর্বলতা এবং অবসন্নতা অনুভব করা।
৩. শরীরে অস্বাভাবিক পিণ্ড: স্তন, ঘাড় কিংবা শরীরের অন্য কোথাও অস্বাভাবিক চাকা বা ফোলা দেখা দেওয়া।
৪. দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা স্বর পরিবর্তন: দীর্ঘদিন কাশি থাকা কিংবা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া।
৫. অস্বাভাবিক রক্তপাত: কোনো কারণ ছাড়াই রক্তপাত হওয়া কিংবা শরীরে সহজে কালশিটে দাগ পড়া।
৬. পেটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা: দীর্ঘদিন পেট ফাঁপা, ব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক অস্বস্তি থাকা।
৭. মল-মূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন: প্রস্রাব বা মলত্যাগের স্বাভাবিক অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
৮. ক্ষত না শুকানো: মুখে ঘা কিংবা ত্বকের ক্ষত দীর্ঘদিনেও ভালো না হওয়া।
৯. লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া: শরীরের বিভিন্ন স্থানে লসিকাগ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব লক্ষণের সবই ক্যানসারের নির্দিষ্ট উপসর্গ নয়। সংক্রমণসহ বিভিন্ন সাধারণ রোগেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে কোনো উপসর্গের কারণ স্পষ্ট না হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ক্যানসার নিয়ে ভুল ধারণাক্যানসার শুধু বয়স্কদের হয়—এমন ধারণা ভুল। একইভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেই ক্যানসারের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়ে যায়, সেটিও সঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স ও বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন বিষয় ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে। কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও সব ঝুঁকি এড়ানো যায় না।
ঝুঁকি কমাতে যেসব অভ্যাস জরুরিক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার, অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি অতিরিক্ত সূর্যালোক থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখা এবং প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) ও হেপাটাইটিস বি-এর টিকা সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ এবং এসব সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
চিকিৎসায় অগ্রগতি, প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণবিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যানসার চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রোগের ধরন, পর্যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে টিউমারের আণবিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে।
চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত ফলোআপ, রোগ পুনরায় দেখা দেওয়ার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা এবং মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাই বয়স কম বলে ক্যানসারের আশঙ্কা উড়িয়ে না দিয়ে শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে সময়মতো রোগ শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক