ভারতের ডেম হেলথের প্রতিষ্ঠাতা এবং রিনিউ হেলথ কেয়ারের স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রাজীব আগরওয়াল এ বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে গবেষণায় উঠে আসা সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোও উপেক্ষা করা উচিত নয়।
গবেষণায় মিলেছে শুক্রাণুর গতিশীলতা কমার ইঙ্গিতশুক্রাণুর ওপর মোবাইল ফোনের প্রভাব নিয়ে একাধিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি গবেষণা এবং চার হাজারের বেশি বীর্যের নমুনা নিয়ে করা একটি বিশ্লেষণে মোবাইল ফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণের সংস্পর্শের সঙ্গে শুক্রাণুর গতিশীলতা ও কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে প্যান্টের সামনের পকেটে ফোন রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি অবস্থান করে। কিছু গবেষণায় এ ধরনের অভ্যাসের সঙ্গে শুক্রাণুর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের ইঙ্গিত মিলেছে। গবেষকেরা এর পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন।
প্রথমত, স্মার্টফোন থেকে নির্গত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ শুক্রাণুর কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। শরীরে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিকেল ও সেগুলো নিষ্ক্রিয় করতে কাজ করা অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। এতে শুক্রাণুর কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দ্বিতীয়ত, ফোন থেকে উৎপন্ন তাপ অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। সুস্থ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শুক্রাণুর উৎপাদন ও গুণমানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাস্তব জীবনের গবেষণায় ভিন্ন চিত্রতবে এসব ঝুঁকির বড় অংশের তথ্য এসেছে গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষার ফলাফল থেকে। বাস্তব জীবনে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় আবার ভিন্ন চিত্রও পাওয়া গেছে।
ডা. রাজীব আগরওয়াল জানান, সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন এমন দম্পতিদের নিয়ে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত গবেষণায় পকেটে মোবাইল ফোন রাখার অভ্যাসের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কিংবা গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, শুধু পকেটে স্মার্টফোন রাখার কারণে পুরুষের বন্ধ্যত্ব হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।
শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?শুক্রাণুর গুণমান ও স্বাস্থ্যের অবনতিতে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে কো-এনজাইম কিউ টেন (CoQ10) সাপ্লিমেন্ট নিয়ে কিছু গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এটি গ্রহণের ফলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমার পাশাপাশি শুক্রাণুর গতিশীলতা বাড়তে পারে।
এ ছাড়া জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই ও লাইকোপেনের মতো উপাদান শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিভিন্ন র্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে উঠে এসেছে। জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম শুক্রাণুর ঘনত্ব ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, লাইকোপেন অক্সিডেটিভ কারণে ডিএনএর ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব উপাদান সবার জন্য প্রয়োজনীয় বা মোবাইল ফোনের বিকিরণজনিত ক্ষতির প্রমাণিত প্রতিষেধক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাও উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে। তাই এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে শুধু স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাসকে দায়ী না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, প্যান্টের পকেটে স্মার্টফোন রাখলেই বন্ধ্যত্ব হবে—এমন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘ সময় ফোন শরীরের খুব কাছাকাছি না রাখার মতো সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক