ফুটবলে কিছু বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি নয়, একটি যুগের অবসান। এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকল ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। টরন্টোর মাঠে পর্তুগালের কাছে ৩-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ক্রোয়েশিয়া। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো দেখা গেল কিংবদন্তি মিডফিল্ডার লুকা মদ্রিচকে।
শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরলাইন যেন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক, সতীর্থ এবং প্রতিপক্ষের চোখ ছিল এক ব্যক্তির দিকে। ভিএআরের সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তের সম্ভাব্য গোল বাতিল হওয়ার পর মদ্রিচের চোখে জমে ওঠা অশ্রু যেন জানিয়ে দিল—দীর্ঘ দুই দশকের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানলেন ক্রোয়েশিয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার।
মাত্র ৪০ লাখ মানুষের দেশ ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিতে পরিণত করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগরদের একজন লুকা মদ্রিচ। মাঝমাঠে তার অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি, নিখুঁত পাস, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্বের গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলের প্রাণভোমরা।
ফুটবলে 'ফিল্ড মার্শাল' শব্দটি সচরাচর ব্যবহার করা না হলেও মদ্রিচের ক্ষেত্রে উপমাটি একেবারেই যথার্থ। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন একজন সেনাপতি পুরো বাহিনীকে পরিচালনা করেন, তেমনি মাঠে ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণ, রক্ষণ এবং ছন্দের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার পায়ে। তিনি হয়তো সবসময় গোল করতেন না, কিন্তু অধিকাংশ আক্রমণের সূচনা হতো তার বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকেই।
২০০৬ সালে জার্মানিতে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মদ্রিচ। এরপর টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ২০ বছরের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে খেলেছেন ২৩টি ম্যাচ, করেছেন দুটি গোল, দিয়েছেন অসংখ্য গোলের সুযোগ তৈরি করা পাস। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে থাকবে তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ ক্ষমতা।
তার ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায় নিঃসন্দেহে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ। সেই আসরে প্রথমবারের মতো ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। একই বছর দীর্ঘ এক দশক ধরে চলে আসা আধিপত্য ভেঙে নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ব্যালন ডি'অরও জয় করেন এই মিডফিল্ড জাদুকর।
২০২২ বিশ্বকাপেও বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে তৃতীয় স্থান এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। আর ২০২৬ সালের বিদায়ী বিশ্বকাপেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রেখেছেন। ৪০ বছর বয়সেও পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৬৬ বার বল স্পর্শ করেন, সফলভাবে তিনটি ট্যাকল সম্পন্ন করেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক দুর্দান্ত আক্রমণ তৈরি করেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, দলকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
কিন্তু ভাগ্য সেদিন তার পাশে ছিল না। শেষ মুহূর্তে জালে বল জড়ালেও ভিএআরের সিদ্ধান্তে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। সেই মুহূর্তেই যেন শেষ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নযাত্রা।
ম্যাচ শেষে আবেগঘন দৃশ্যের জন্ম দেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘদিনের সতীর্থ ও বন্ধু মদ্রিচকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানান তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি সময়ে এই দুই তারকা একসঙ্গে চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেছিলেন। একজন ছিলেন গোলের নায়ক, অন্যজন সেই গোলের কারিগর।
মদ্রিচকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রোনালদো বলেন, "লুকার সঙ্গে অসংখ্য ম্যাচ খেলেছি। সে ফুটবল ইতিহাসের একজন সত্যিকারের কিংবদন্তি। তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। আবারও তার বিপক্ষে খেলতে পারা আমার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল।"
লুকা মদ্রিচের জীবনগল্পও অনুপ্রেরণার প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব, শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা, প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সংগ্রাম—সব বাধা অতিক্রম করে তিনি পৌঁছেছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে। তার ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, প্রতিভা শুধু অনুকূল পরিবেশে নয়, কঠিন বাস্তবতার ভেতর থেকেও জন্ম নিতে পারে।
মদ্রিচ কখনো শুধু একজন মিডফিল্ডার ছিলেন না। তিনি ছিলেন খেলার ছন্দের নির্মাতা, সময়ের নিয়ন্ত্রক এবং নেতৃত্বের নীরব প্রতীক। তার পাস ছিল শিল্পের মতো নিখুঁত, সিদ্ধান্ত ছিল অসাধারণ পরিপক্ব, আর উপস্থিতি পুরো দলকে আত্মবিশ্বাস জোগাত।
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর দেখা যাবে না ক্রোয়েশিয়ার ১০ নম্বর জার্সিধারী এই কিংবদন্তিকে। আর কোনো সন্ধ্যায় তার নিখুঁত আউটসাইড পাস প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে দেবে না। অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত শরীর নিয়েও তিনি আর দলকে সামনে এগিয়ে নেবেন না।
তবু কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা বেঁচে থাকেন স্মৃতিতে, অনুপ্রেরণায়, ইতিহাসে এবং প্রতিটি প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য গোল, শিরোপা ও রেকর্ডের গল্প লেখা হবে। কিন্তু মাঝমাঠের এক নীরব সেনাপতি—লুকা মদ্রিচের গল্প থাকবে চিরকাল আলাদা মর্যাদায়।

প্রথম দর্পণ,স্পোর্টস ডেক্স