ঝড়ের আগাম বার্তায় এআই, বাড়তে পারে প্রস্তুতির সময়

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ দুপুর
  • ৩২৪৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
১০ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস এক মিনিটেরও কম সময়ে তৈরি করতে পারে গ্রাফকাস্ট; ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতা অনুমানেও নতুন অগ্রগতি

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। অতীতের আবহাওয়ার বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই মডেল এখন ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি ও তাপমাত্রা সম্পর্কে দ্রুত পূর্বাভাস দিতে পারছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতা নির্ধারণে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির সুযোগ বাড়াতে পারে। তবে এআইয়ের পূর্বাভাস এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়; সরকারি আবহাওয়া সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়েই তা ব্যবহার করা জরুরি।

কীভাবে কাজ করে এআই

স্যাটেলাইট, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, রাডার, সমুদ্রের বয়া ও বায়ুচাপ পরিমাপক যন্ত্র থেকে আবহাওয়াবিদরা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রচলিত সংখ্যাভিত্তিক পূর্বাভাসব্যবস্থায় বায়ুমণ্ডলের পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ও গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি গণনা করা হয়।

এআইভিত্তিক মডেল অতীতের আবহাওয়ার তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরন ও সম্পর্ক শনাক্ত করতে শেখে। বর্তমান আবহাওয়ার অবস্থা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনুমান করে মডেলটি। এর মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে একাধিক সম্ভাব্য পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব।

তবে কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য কম থাকলে কিংবা আবহাওয়ার পরিস্থিতি অতীতের তথ্যের তুলনায় অস্বাভাবিক হলে পূর্বাভাসে ভুল হতে পারে। তাই এআইয়ের ফল যাচাই, স্থানীয় তথ্যের ব্যবহার এবং আবহাওয়াবিদদের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

এক মিনিটেরও কম সময়ে ১০ দিনের পূর্বাভাস

এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাসের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি ‘গ্রাফকাস্ট’ (GraphCast)। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এই মডেল বৈশ্বিক আবহাওয়ার ১০ দিনের পূর্বাভাস তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট পরীক্ষায় ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ইসিএমডব্লিউএফ) উচ্চমানের প্রচলিত পূর্বাভাসব্যবস্থা এইচআরইএসের তুলনায় গ্রাফকাস্ট ১ হাজার ৩৮০টি যাচাই-লক্ষ্যের প্রায় ৯০ শতাংশে ভালো ফল দেখিয়েছে। বিশেষায়িত হার্ডওয়্যারে মডেলটি এক মিনিটেরও কম সময়ে ১০ দিনের পূর্বাভাস তৈরি করতে পারে। <Cite refs={["turn368845search0","turn368845search12"]}/>

তবে এই ফল নির্দিষ্ট গবেষণা ও পরীক্ষার ভিত্তিতে পাওয়া। সব অঞ্চল, সব ধরনের আবহাওয়া কিংবা প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সাফল্য নিশ্চিত নয়।

২০২৪ সালে গুগল ডিপমাইন্ড ‘জেনকাস্ট’ (GenCast) নামে আরেকটি মডেল প্রকাশ করে। এটি ১৫ দিন পর্যন্ত আবহাওয়ার সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে। একটি মাত্র সম্ভাব্য ফল দেখানোর পরিবর্তে একাধিক পূর্বাভাস তৈরি করায় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা মূল্যায়নে সহায়তা করে। গবেষণায় ইসিএমডব্লিউএফের এনসেম্বল পূর্বাভাসব্যবস্থার সঙ্গে তুলনায় ১ হাজার ৩২০টি যাচাই-লক্ষ্যের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশে জেনকাস্ট ভালো ফল দেখিয়েছে। <Cite refs={["turn368845search2","turn368845search6"]}/>

ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসে নতুন অগ্রগতি

ঘূর্ণিঝড় কোন দিকে এগোবে, কতটা শক্তিশালী হবে এবং কোথায় উপকূলে আঘাত হানতে পারে—এসব অনুমান করা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের অন্যতম কঠিন কাজ। ঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতার সামান্য পরিবর্তনও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রায় বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

২০২৫ সালে গুগল ডিপমাইন্ড ও গুগল রিসার্চ ‘ওয়েদার ল্যাব’ (Weather Lab) নামে একটি পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম চালু করে। এতে এআইভিত্তিক ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ও সম্ভাব্য গতিপথ দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ প্রায় সাত দিন আগেই ধারণ করতে পেরেছিল তাদের পরীক্ষামূলক মডেল। তবে ওই মডেল তখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ছিল। <Cite refs={["turn368845search7","turn368845search3"]}/>

২০২৬ সালের আগস্টে গুগল ডিপমাইন্ড ও গুগল রিসার্চ ‘ওয়েদারনেক্সট’ প্রযুক্তির ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস নিয়ে নতুন গবেষণার কথা জানায়। গবেষণায় মডেলটি ঝড়ের গতিপথ, তীব্রতা ও বাতাসের বিস্তৃতি অনুমানে উন্নত ফল দেখিয়েছে। আগের মডেলগুলোর তুলনায় গড়ে এক দিনের বেশি পূর্বাভাসগত সুবিধা পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ নতুন মডেলের তিন দিনের পূর্বাভাসের নির্ভুলতা আগের মডেলের দুই দিনের পূর্বাভাসের কাছাকাছি হতে পারে। এটি গবেষণাভিত্তিক গড় ফল; প্রতিটি ঝড়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় আগে সঠিক পূর্বাভাসের নিশ্চয়তা নয়। <Cite refs={["turn368845search1","turn368845search5"]}/>

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলরেখা, ঘনবসতি এবং বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। এসব দুর্যোগে আগাম সতর্কতা পাওয়া গেলে উপকূলের জেলে ও মাছ ধরার নৌযানকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া এবং উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত রাখা সহজ হতে পারে।

কৃষক, লবণচাষি ও নদী-সমুদ্রনির্ভর মানুষের জন্যও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ। অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা আগে জানা গেলে ফসল রক্ষা, পানি নিষ্কাশন এবং জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা করা যায়।

তবে বাংলাদেশে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু বৈশ্বিক মডেল ব্যবহার যথেষ্ট নয়। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, স্যাটেলাইট, সমুদ্রের অবস্থা, বৃষ্টিপাত ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতির তথ্য সমন্বয় করতে হবে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোও জরুরি।

বন্যা ও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসেও ব্যবহার

এআইয়ের প্রয়োগ ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিবৃষ্টি, বন্যার সম্ভাবনা, তাপপ্রবাহ, প্রবল বাতাস ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও এ প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে বন্যার ঝুঁকি নিরূপণে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের পাশাপাশি নদীর পানির স্তর, বাঁধ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও স্থানীয় জনবসতির তথ্য প্রয়োজন।

এআই একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেও সহায়তা করতে পারে। যেমন, একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাসে ভিন্ন ভিন্ন এলাকা ঝুঁকিতে দেখা গেলে কর্তৃপক্ষ একাধিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। তবে কোন পরিস্থিতির সম্ভাবনা কতটা, তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে মূল্যায়ন করতে হবে।

সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা

আবহাওয়া অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। বায়ুমণ্ডলের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। কোনো মডেল বৈশ্বিক পর্যায়ে ভালো ফল দেখালেও বাংলাদেশের নির্দিষ্ট উপকূল বা নদীঘেরা জনপদে একই নির্ভুলতা বজায় রাখবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ ছাড়া নির্ভুল পূর্বাভাস তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছানোও জরুরি। মোবাইল ফোনের বার্তা, রেডিও, টেলিভিশন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সহজ ভাষায় সতর্কতা পৌঁছানো গেলে প্রযুক্তির সুফল বাড়তে পারে।

এআইয়ের পূর্বাভাসকে সরকারি আবহাওয়া সতর্কবার্তার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য, আবহাওয়াবিদদের মূল্যায়ন ও সরকারি সতর্কতার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের সাফল্য শুধু কত দ্রুত হিসাব করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। কত আগে নির্ভরযোগ্য সতর্কতা দেওয়া গেল, কত মানুষের কাছে তা পৌঁছাল এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কতটা কমানো গেল—সেটিই হবে এর কার্যকারিতার বড় মাপকাঠি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad