পারমাণবিক বিজ্ঞান হলো পরমাণু ও তার নিউক্লিয়াসের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত নিউক্লিয়ার ফিশন বা পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করা হয়।
রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর মতো বিভাজনযোগ্য জ্বালানির নিউক্লিয়াসে নিউট্রন আঘাত করলে তা বিভাজিত হতে পারে। এ সময় তাপ ও আরও নিউট্রন নির্গত হয়। নির্গত নিউট্রন অন্য নিউক্লিয়াসকে বিভাজিত করলে শৃঙ্খল বিক্রিয়া তৈরি হয়। রিঅ্যাক্টরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এই বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত রাখে।
উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। পরে বাষ্প ঠান্ডা করে পানিতে পরিণত করা হয়। কন্ট্রোল রডসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিউট্রনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে রিঅ্যাক্টরের বিক্রিয়া পরিচালনায় সহায়তা করে।
বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রবাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে দুটি রিঅ্যাক্টর রয়েছে এবং পরিকল্পিত মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত সুফল নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য পরিচালনা, জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর।
পারমাণবিক শক্তির সুবিধাপারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম সুবিধা হলো, তুলনামূলকভাবে অল্প জ্বালানি ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কেন্দ্রটি সচল থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহেও ভূমিকা রাখতে পারে। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো আবহাওয়নির্ভর উৎসের বিপরীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ আবহাওয়ার তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিপুল কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় না। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উৎস হিসেবে পারমাণবিক শক্তিকে বিবেচনা করা হয়। তবে কেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি উৎপাদন ও পুরো জীবনচক্রের পরিবেশগত প্রভাবও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ঝুঁকি কোথায়পারমাণবিক শক্তির বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং গুরুতর দুর্ঘটনা প্রতিরোধ। যন্ত্রপাতির ত্রুটি, শীতলীকরণব্যবস্থার ব্যর্থতা, মানুষের ভুল কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গুরুতর দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই রিঅ্যাক্টরের নকশা, একাধিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ কর্মী এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও বিশেষভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হয়। বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী তা নিরাপদে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। এ ক্ষেত্রে অবহেলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিউক্লিয়ার ফিউশননিউক্লিয়ার ফিশনের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়ার ফিউশন নিয়েও গবেষণা করছেন। ফিউশনে দুটি হালকা নিউক্লিয়াস একত্র হয়ে ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং বিপুল শক্তি নির্গত হতে পারে। সূর্যসহ নক্ষত্রগুলোতে এ প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে ঘটে।
নিয়ন্ত্রিত ফিউশন ভবিষ্যতে শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে পৃথিবীতে ফিউশন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিতভাবে চালিয়ে ধারাবাহিক ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো বড় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। তাই একে বর্তমানে সহজলভ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তপারমাণবিক শক্তিকে নিঃশর্ত আশীর্বাদ কিংবা সম্পূর্ণ অভিশাপ—কোনোটিই বলা যায় না। এর মাধ্যমে কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সুযোগ রয়েছে, আবার নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উচ্চ নির্মাণব্যয়ের মতো বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশে এ প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তামান অনুসরণ, দক্ষ জনবল তৈরি, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমেই পারমাণবিক শক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক