আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যে গ্রামীণ জীবন, শোষণ ও সমাজবাস্তবতার অনন্য চিত্র

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৯ বিকাল
  • ৪২১৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাংলার গ্রামীণ জনজীবন, দারিদ্র্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, শ্রেণিবৈষম্য ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট—এসব বিষয় কথাসাহিত্যে বাস্তবধর্মী শিল্পরূপ দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা এবং ক্ষমতাবানদের শোষণের চিত্র গভীরভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’, ‘পদ্মার পল্লী দ্বীপ’সহ বিভিন্ন গল্পে সমাজের প্রচলিত সংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁর শিল্পিত অবস্থান স্পষ্ট।

সাহিত্যসমালোচকদের মতে, আবু ইসহাকের কথাসাহিত্য কেবল গ্রামীণ জীবনের বিবরণ নয়; বরং দেশবিভাগ-পরবর্তী পূর্ববাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাঁর রচনায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, বিশ্বাস ও যুক্তি, সামাজিক অনুশাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দ্বন্দ্ব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

দেশবিভাগ ও গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতা

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ববাংলার মানুষের জীবনে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।

এই প্রেক্ষাপট আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রামীণ সমাজের নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের অসহায়ত্ব, অদৃষ্টবাদ, কুসংস্কার এবং প্রভাবশালী শ্রেণির শোষণ তিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতাও সমালোচিত হয়েছে।

‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’: কুসংস্কার ও শোষণের বিরুদ্ধে জয়গুনের লড়াই

আবু ইসহাকের প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প ‘অভিশাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে। উপন্যাসটিতে দুর্ভিক্ষ, গ্রামীণ দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার এবং প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্বসংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়গুন। সমাজের চোখে অভিশপ্ত একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নেয় সে। প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার এই সিদ্ধান্তই তাকে সামাজিক বিরোধের মুখে দাঁড় করায়। ধর্মীয় বিধিনিষেধের দোহাই দিয়ে নারীস্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং দরিদ্র মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা উপন্যাসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ধর্মের অপব্যবহার, পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার সম্মিলিত চাপে জয়গুনকে অসহায় করে তোলা হয়। ধর্মীয় বিধিনিষেধ অমান্য করার অভিযোগে তাকে একঘরে করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু জয়গুন নিজের অবস্থানে অনড় থাকে। তার প্রতিবাদী উচ্চারণ—‘খাইট্যা খামু। কেওরডা চুরি কইর‌্যাও খাইনা, খ’রাতও খাইনা। কউক না যার মনে যা’—তার আত্মমর্যাদা ও বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রত্যয়ের পরিচয় বহন করে।

‘পদ্মার পল্লী দ্বীপ’: ভূমি, ক্ষমতা ও মানুষের দ্বন্দ্ব

আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পদ্মার পল্লী দ্বীপ’। এতে ভূমির মালিকানা, চর দখল, সামাজিক প্রভাব এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তির সংঘাত উঠে এসেছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি উপন্যাসে প্রেম, সম্পর্ক ও ধর্মীয় প্রভাবের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

সুন্দরী রূপজানকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জঙ্গুরুল্লার পীর বাবাকে ব্যবহারের ঘটনা ধর্মীয় প্রভাবের অপব্যবহারের দিকটি উন্মোচন করে। অন্যদিকে ফজল জেলে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মী মতির সংস্পর্শে আসে। মতির কাছ থেকে উদারতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতার শিক্ষা পেয়ে তার মধ্যে শোষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি হয়।

এ উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সামাজিক প্রভাব যখন যুক্তিবিচার ও নৈতিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাসও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

ছোটগল্পে কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহারের চিত্র

আবু ইসহাকের গল্পগ্রন্থ ‘হারেম’ ও ‘মহাপতঙ্গ’-এর গল্পগুলোতে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জীবনসংগ্রাম, লোকবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতাবানদের প্রভাব উঠে এসেছে।

‘কানাভুলা’ গল্পে পীরকেন্দ্রিক অন্ধবিশ্বাসের সমালোচনা করেছেন লেখক। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর প্রসবকষ্ট লাঘবের আশায় জাহিদ পীরের কাছ থেকে পানি পড়া আনতে যায়। কিন্তু ফিরে এসে পীরের বাড়ি থেকে ডাক্তার ও নার্সকে বের হতে দেখে সে বিস্মিত হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পীরের অলৌকিক ক্ষমতার দাবির অসারতা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

‘শয়তানের ঝাড়ু’ গল্পেও পীরের অলৌকিক ক্ষমতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। হাজি বাবার কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ গ্রামের মানুষের মধ্যে মোতাহারের জাদু প্রদর্শনের পর সন্দেহ তৈরি হয়। এতে অন্ধবিশ্বাসের জায়গায় যুক্তিবোধের উন্মেষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

‘দাদির নদী দর্শন’ গল্পে ধর্মীয় অজ্ঞতা, রক্ষণশীলতা ও আধুনিক শিক্ষার প্রতি বিরূপ মনোভাবের চিত্র তুলে ধরেছেন আবু ইসহাক। নদীবিধৌত দেশে জন্মেও জীবনে একবার নদী না দেখা দাদির জীবন কেটেছে অন্দরমহলে। বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষাকে কুফরি বিদ্যা মনে করা এবং আধুনিকতার নানা উপকরণকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করার মধ্য দিয়ে তাঁর সংকীর্ণ মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

‘আবর্ত’ গল্পে প্রেম, সম্পত্তি ও গ্রামীণ ক্ষমতার রাজনীতির সংঘাত ফুটে উঠেছে। নুরজাহান ও ইউনুসের প্রেমের পরিণতি সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে করুণ হয়ে ওঠে। চাচা ওমর মোড়লের প্রতারণায় ইউনুস পৈতৃক সম্পত্তি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোর নিষ্ঠুর চেহারা গল্পটিতে প্রকাশ পেয়েছে।

অন্যদিকে ‘জোঁক’ গল্পে শ্রমজীবী মানুষের শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জোঁক যেমন মানুষের শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে, তেমনি সমাজের কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তি দরিদ্র মানুষের শ্রম ও সম্পদ শোষণ করে বেঁচে থাকে। গল্পের প্রতীকের মধ্য দিয়ে ভূমির মালিক ও মহাজনদের শোষণ এবং তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদী চেতনা তুলে ধরেছেন লেখক।

‘মহাপতঙ্গ’ গল্পে একজোড়া চড়ুই পাখির দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। গল্পটিতে শোষণমুক্ত, শ্রেণিবৈষম্যহীন ও কল্যাণকামী সমাজের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানের অগ্রগতির নেতিবাচক ব্যবহারের দিকটিও লেখকের বিবেচনায় এসেছে।

সময় অতিক্রম করেও প্রাসঙ্গিক আবু ইসহাক

আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কারকে প্রশ্ন করার সাহস। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে দেখলেও ধর্মের নামে ব্যবসা, ভণ্ডামি ও মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতার সমালোচনা করেছেন তিনি।

তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামীণ জীবনের অর্থনৈতিক সংকট, নারী-পুরুষের অসম সম্পর্ক, শ্রেণিশোষণ, লোকাচার এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে। ভাষা ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তাঁর রচনায় বর্ণনাধর্মী প্রবণতা থাকলেও গ্রামীণ সমাজের বাস্তব চিত্রায়ণে তাঁর দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সব মিলিয়ে আবু ইসহাকের উপন্যাস ও ছোটগল্প শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের সমাজচিত্র নয়; বরং সমাজের ভেতরে থাকা বৈষম্য, শোষণ, অন্ধবিশ্বাস ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক প্রকাশ। এ কারণেই তাঁর কথাসাহিত্য সময় পেরিয়েও পাঠক ও গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক।

তথ্যসূত্র: ড. নূর-ই আলম সিদ্দিকীর ‘আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প’ শীর্ষক সাহিত্য-প্রবন্ধ, দৈনিক যুগান্তর, সাহিত্য সাময়িকী, ৩০ অক্টোবর ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad