অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের মরণফাঁদ, প্রাণহানি বেড়ে ৫৪

  • মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার
  • আপলোড সময় : ২০ জুলাই ২০২৬, ০১:২৭ দুপুর
  • ১৮৮৮২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
http://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বর্ষা এলেই চট্টগ্রামজুড়ে ফিরে আসে পাহাড়ধসের শঙ্কা। প্রশাসনের সতর্কবার্তা, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় মাইকিং এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান সত্ত্বেও প্রতি বছরের মতো এবারও প্রাণহানির মিছিল থামেনি। টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেশের সাতটি জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৫৩ জনই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার বাসিন্দা।

চট্টগ্রাম বিভাগে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের পাশাপাশি নিচু এলাকাগুলোতে আকস্মিক বন্যারও সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রামে একদিনে ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা বহু বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দেশে সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।

কেন অস্বাভাবিক হলো এবারের বৃষ্টি

সাধারণভাবে বাংলাদেশের মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭১ শতাংশ বর্ষা মৌসুমে হয়ে থাকে। তবে এবার বৃষ্টিপাতের ধরণ ছিল ব্যতিক্রমী।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের ভাষ্য, চলতি বছর মৌসুমি নিম্নচাপটি বাংলাদেশের উপকূল ঘেঁষে পশ্চিমমুখী অগ্রসর হওয়ায় চট্টগ্রাম বিভাগের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে আর্দ্র বাতাস আটকে যায়। ফলে একই এলাকায় কয়েক দিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়।

তিনি জানান, জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল। পরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র প্রভাব এবং অনুকূল আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে সেই ঘাটতি অল্প সময়েই অতিভারী বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে পূরণ হয়।

পাহাড়ধসের পেছনে মানবসৃষ্ট কারণও বড়

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ধস শুধু অতিবৃষ্টির কারণে ঘটে না। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে মাটি সম্পৃক্ত হয়ে ঢাল দুর্বল হয়ে পড়লে ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা হয়েছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও উদ্ভিদবিন্যাস ধ্বংস হওয়ায় মাটির দৃঢ়তা কমে গেছে। ফলে আগের তুলনায় কম বৃষ্টিতেই এখন ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর বয়স প্রায় ২৫ লাখ বছর। এগুলো মূলত বালুময় ও ক্ষয়িষ্ণু প্রকৃতির হওয়ায় অতিরিক্ত পানি জমলে মাটির ওজন বেড়ে যায় এবং মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পুরো স্তর নিচে নেমে ধস সৃষ্টি হয়।

তিনি আরও বলেন, পাহাড় ধ্বংস ও প্রাকৃতিক ক্ষয় এক বিষয় নয়। অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, অবৈধ বসতি এবং উদ্ভিদবিনাশই বর্তমানে পাহাড়ধসের প্রধান কারণ।

অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর লালখান বাজারের মতিঝর্ণাসহ ছয়টি স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন প্রাণ হারান। এরপর ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে নিহত হন ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ। এছাড়া ২০০৮, ২০১০, ২০১১, ২০১৫ ও ২০১৯ সালেও একাধিক প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে।

ঝুঁকি এখনও কাটেনি

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, পাহাড়ের মাটি এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। এর মধ্যে আবার ভারী বৃষ্টিপাত হলে আলগা হয়ে থাকা অংশ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে ঠিক কখন বা কোথায় বড় ধরনের পাহাড়ধস ঘটবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

করণীয় কী

বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করে আগাম সতর্কতা জারি, পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, নতুন করে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা, অবৈধ পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এ কাজে জড়িত অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad