মডেল ও অভিনেত্রী তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর নারাজি আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ আদেশ দেন। আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী নারাজি আবেদন দাখিল করেন। পরে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ ও উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত এ নির্দেশ দেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই) মামলাটির তদন্ত শেষে যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে বাদী নারাজির আবেদন করেন। আদালত আবেদনটির বিষয়বস্তু শুনে ও সাক্ষীদের পরীক্ষা করে তা মঞ্জুর করেছেন।
৭৫ হাজার টাকার শাড়ি নিয়ে বিরোধমামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বাদী একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। গুলশানের ১২৭ নম্বর রোডে তাঁর একটি ফ্যাশন হাউস ও স্টুডিও রয়েছে। বিভিন্ন ফ্যাশন শো ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়ার সূত্রে তাঁর সঙ্গে তানজিন তিশার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তিশা তাঁর সাবেক গাড়িচালকের মাধ্যমে বাদীর কাছ থেকে একটি শাড়ি নেন। বাদীর দাবি, শাড়িটির মূল্য ৭৫ হাজার টাকা এবং অনুষ্ঠান শেষে পরদিন সেটি ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে শাড়িটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শাড়িটি ফেরত চেয়ে বাদী ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান। তবে কথোপকথনের স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান, তিশা ওই বার্তাগুলো দেখেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে এর কারণ হিসেবে তাঁর নিয়মিত মেসেঞ্জার ব্যবহার না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
মেসেঞ্জারে কথোপকথন, পরে থানায় জিডিপ্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাদী তিশাকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানান। ওই বছরের ১৮ মে একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা ও কুশল বিনিময় হয়। পরে ফ্যাশন হাউসের ট্রায়াল রুম ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও মনোমালিন্য তৈরি হয়।
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাদী আবার শাড়িটি ফেরত দেওয়ার জন্য তিশাকে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান। শাড়িটির ছবি পাঠানোর পর তিশা জানান, বিষয়টি তাঁর তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ছে না; খুঁজে দেখে জানাবেন। তিশার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সাবেক গাড়িচালকের শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা না দিয়েই চাকরি ছেড়ে চলে যান।
পরবর্তী কথোপকথনে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। ৭ নভেম্বর বাদী শাড়িটি ফেরত দিতে এবং আগের বার্তাগুলো দেখতে তিশাকে অনুরোধ করেন। ১০ নভেম্বর তিশা ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিষয় আলাদা রাখার কথা বলেন। একই সঙ্গে জানান, শাড়িটি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তাঁর লোকজন ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং বাদীপক্ষকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
এরপর ১২ নভেম্বর বাদী গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি জানার পর তিশা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করেন।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনিপিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে তানজিন তিশা জানিয়েছেন, বাদীর সঙ্গে তাঁর আগে ভালো সম্পর্ক ছিল। এর আগে বাদীর কাছ থেকে আরও শাড়ি নিয়ে অনুষ্ঠানে পরার পর সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কথা না হওয়ায় তিনি এই শাড়িটির কথা ভুলে গিয়েছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার বিষয়টি জানার পর তিশা ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ ডাকযোগে শাড়িটি বাদীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন। তদন্ত কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, বাদীকে অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি তা উপস্থাপন করতে পারেননি।
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শাড়ি ফেরত দেওয়া এবং প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। একইভাবে তিশার পাঠানো বার্তায় হুমকির অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে বাদী ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত না হয়ে নারাজি আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে দিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে নতুন করে তদন্ত হবে

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক