সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১১ লাখ ৯৫ হাজার ১২৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ২৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। এ ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৬৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯৮ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রার ২৫ শতাংশ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থবছরের জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত এ খাত থেকে নিট ২৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকেই ঋণ নেয় সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি ও সঞ্চয়পত্র খাত। বৈদেশিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না এলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
সঞ্চয়পত্রে ঋণ ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকাবাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাতে ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সে অনুযায়ী রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ফলে ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। এমনকি পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধেও নতুন ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।
সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকাচলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে এনবিআর।
অপচয় রোধ ও রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদবিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিভিন্ন কারণে সরকারের ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে, অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই। আগের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়া এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক