অল্প সম্মানীতে সংসার চালাতে হিমশিম লালমনিরহাটের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
ইমামতি, আজান, ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া, জানাজা পড়ানোসহ সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। অথচ অল্প সম্মানীতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে লালমনিরহাটের অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিনকে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলোর ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী নির্ভর করে মুসল্লিদের চাঁদা, স্থানীয় মানুষের অনুদান ও মসজিদ কমিটির আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। ফলে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ মসজিদে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ইমাম মাসে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা সম্মানী পান। মুয়াজ্জিনদের সম্মানী আরও কম। কোনো কোনো মসজিদে নগদ অর্থের পাশাপাশি চালসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে এসব আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বড়বাড়ী ইউনিয়নের শিমুলতলা বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী পান। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরে এই অর্থ দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

নয়ারহাট নিদাড়িয়া জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ আনসার আলী মাসে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকা সম্মানী পান। এর পাশাপাশি তিনি সাপ্তাহিক মুষ্টির চাল পেতেন। একই সঙ্গে তাকে ইমামের দায়িত্বও পালন করতে হয়।

কনগর জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন ও পেশ ইমাম মোহাম্মদ আখিয়ুল ইসলাম ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে সীমিত আয়ে সংসার চালানোর কষ্টের কথা জানিয়েছেন।

মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলরা জানান, গ্রামীণ মসজিদগুলোর আয় মূলত মুসল্লিদের চাঁদা ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। মুসল্লি কম হলে কিংবা অনুদান কম উঠলে ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী বাড়ানো তো দূরের কথা, অনেক সময় নিয়মিত সম্মানী পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নির্বাচিত মসজিদে রাষ্ট্রীয় সম্মানী

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিক সংকট কিছুটা লাঘব করতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নির্বাচিত মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৮২ হাজার ৬৫৬টি নির্বাচিত মসজিদের ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৬৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন ইমাম মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার টাকা এবং খাদেম ২ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন। এ ছাড়া প্রত্যেকে দুই ঈদে ১ হাজার টাকা করে মোট ২ হাজার টাকা উৎসব ভাতা পাবেন।

কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে দেশের সব মসজিদ এই কর্মসূচির আওতায় আসছে না; নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নির্বাচিত মসজিদগুলোই প্রাথমিকভাবে এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। তাদের মতে, বর্তমান বাজারদর ও পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় সম্মানী কিছুটা হলেও আর্থিক স্বস্তি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত সম্মানী বৃদ্ধি এবং একটি স্থায়ী কাঠামো প্রয়োজন।

মডেল মসজিদে তুলনামূলক বেশি সম্মানী

লালমনিরহাট সদর উপজেলা মডেল মসজিদে বর্তমানে পেশ ইমাম হিসেবে মুফতি মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম নূরী, মুয়াজ্জিন হিসেবে মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান এবং খাদেম হিসেবে মোহাম্মদ রেজাউল করিম ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক দায়িত্ব পালন করছেন।

মডেল মসজিদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পেশ ইমামের মাসিক সম্মানী ১৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনের ১০ হাজার টাকা এবং খাদেমদের প্রত্যেকের ৭ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পেশ ইমাম মুফতি মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম নূরী বলেন, ইমামদের দায়িত্ব শুধু নামাজ পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় শিক্ষা, জানাজা, সামাজিক পরামর্শসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানী এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা প্রয়োজন।

মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও আয় সে অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে পরিবার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্মানীর উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন।

রয়েছে বেতন কাঠামোর নির্দেশনা

এদিকে সরকার ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। এতে মসজিদের বিভিন্ন পর্যায়ের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সিনিয়র পেশ ইমাম জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫-এর পঞ্চম গ্রেড, পেশ ইমাম ষষ্ঠ গ্রেড এবং ইমাম নবম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা। প্রধান মুয়াজ্জিন দশম এবং মুয়াজ্জিন ১১তম গ্রেডে থাকবেন। প্রধান খাদেম ১৫তম এবং খাদেম ১৬তম গ্রেডে বেতন পাবেন।

তবে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও পাঞ্জেগানা মসজিদের ক্ষেত্রে মসজিদের সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। নীতিমালায় মসজিদের কর্মীদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী আবাসন, ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য সঞ্চয় এবং চাকরি শেষে এককালীন সম্মাননার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন লালমনিরহাটের উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ মসজিদের জনবলের সম্মানী ও ব্যবস্থাপনা সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৪ সালে জাতীয় সংসদে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদে প্রায় ১৭ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিন কর্মরত রয়েছেন।

লালমনিরহাটের গ্রামীণ মসজিদগুলোর বাস্তবতায় ইমাম-মুয়াজ্জিনদের স্বল্প সম্মানী ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান তাদের আর্থিক সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় সম্মানীর উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সম্মানী নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad