দীর্ঘ ৬ বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে চালুর মুখ দেখতে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কওমি জুট মিল ।
তবে দীর্ঘদিনের পরিচিত এই পাটকলটি আর আগের রূপে ফিরছে না। 'সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড' নামে নতুন পরিচয় নিয়ে এটি এখন তৈরি পোশাক কারখানায় রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) কাছ থেকে ৩০ বছরের জন্য মিলটি ইজারা নিয়েছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
নতুন এই উদ্যোগে প্রাণ-আরএফএল মূলত তৈরি পোশাক টেক্সটাইল ও অন্যান্য বহুমুখী পণ্য তৈরির পাশাপাশি কিছু পাটজাত পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এতে করে সিরাজগঞ্জের প্রায় ৫ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কারখানাটি নতুন রূপ পেলেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের এক উৎকণ্ঠা—বিলীন হতে বসেছে জুট মিলের মূল অবকাঠামো ও কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।
সরজমিনে দেখা যায়, একসময়ের ব্যস্ত কওমি জুট মিল এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। বন্ধ পড়ে রয়েছে হাজার হাজার দামি মেশিনারি ও পার্টস, মিলের নিজস্ব ঢালাই কারখানা (ফাউন্ড্রি)
১৫টি সুবিশাল পাটের গুদাম পরিবহন কাজের নিজস্ব রেলপথ, আবাসিক ভবন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর
ব্যবহার না করায় অযত্নে-অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকার এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকি না থাকায় মিলের অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ইতোমধ্যে চুরি হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মিলের বর্তমান মহাব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন জানান, প্রাণ-আরএফএল এখানে পোশাক তৈরি করবে—এটুকুই তারা জানেন। তবে মিলের পুরোনো যন্ত্রাংশের কী হবে বা পাটের পণ্য তৈরি হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বিজেএমসির।
অন্যদিকে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমজান আলী সৈকত জানান, তারা ইতোমধ্যে পোশাক তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। বিজেএমসিকে পুরোনো যন্ত্রাংশ দ্রুত সরিয়ে মিলটি পরিষ্কার করে দেওয়ার তাগাদাও দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ এসব যন্ত্রপাতি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
১৯৬০ সালে প্রায় ৩৫০ একর জমির ওপর সিরাজগঞ্জ কওমি জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে সরাসরি ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। চালুর পর থেকেই বস্ত্র, ব্যাগ ও দড়ি উৎপাদনে এটি ব্যাপক ভূমিকা রাখে এবং এলাকার পাটচাষিদের ভাগ্য বদলে দেয়।
২০০৭ সালে পরিবেশবান্ধব পাটের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে মিলটি প্রথম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জাতীয় জুট মিল’ নামে পুনর্জন্ম হয় মিলটির। চালুর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ৯ কোটি টাকা লাভ করে এবং উৎপাদনে সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করে।
২০২০ সালে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আবারও লোকসানে পড়ে কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় জুট মিল শ্রমিক আন্দোলনের সভাপতি আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, এটি মূলত একটি অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভরা মৌসুমে বাজার থেকে পাট কেনা সম্ভব হতো না।
কৃষকের কাছ থেকে বেল্ট আকারে পাট কিনতে দরপত্রের (টেন্ডার) সব শর্ত পূরণে ৩ মাসের বেশি সময় লেগে যেত। ততক্ষণে পাটের বাজার শেষ হয়ে যেত। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি দামে নিম্নমানের পাট কিনতে হতো, যা মিলটিকে লোকসানের দিকে ঠেলে দেয়।
তিনি আরও বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যই ছিল সরকারি এই লাভজনক খাতকে ধ্বংস করে বেসরকারি খাতকে সুযোগ করে দেওয়া। যেখানে মিল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রতি মাসে ১৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বসিয়ে বসিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছিল।
দীর্ঘদিন মিলটি বন্ধ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় আঘাত এসেছে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকরা বিকল্প কর্মসংস্থান না পেয়ে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে সিরাজগঞ্জ শহরে আশঙ্কাজনকভাবে রিকশার সংখ্যা বেড়েছে, যা শহরের যানজট ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন ফ্যাশন কারখানাটি চালু হলে কর্মসংস্থান ফিরবে ঠিকই, তবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই পাটশিল্প তার অস্তিত্ব হারিয়ে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ