ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, ফাতিমা আল-ফিহরি নিজের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যয় করে ফেজে একটি মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠান বিস্তৃত হয়ে ইসলামী জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি ভাষা, আইন, গণিত, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।
কাইরুয়ান থেকে ফেজেআনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরুয়ানে জন্ম নেন ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরি আল-কুরাইশিয়া। তার পরিবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ব্যবসায়িক কারণে তার বাবা মুহাম্মাদ আল-ফিহরি পরিবার নিয়ে মরক্কোর ফেজে চলে যান এবং সেখানে সচ্ছলতা অর্জন করেন।
পারিবারিক পরিবেশেই ফাতিমা ইসলামি শিক্ষা, কোরআন-হাদিস ও ফিকাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে স্বামী, বাবা ও ভাইকে হারানোর পর তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হন।
সেই সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় না করে জনকল্যাণে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন ফাতিমা ও তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি। মারিয়াম আল-আন্দালুস মসজিদ নির্মাণে সম্পদ ব্যয় করেন। আর ফাতিমা প্রতিষ্ঠা করেন আল-কারাউইয়্যিনের ভিত্তি।
মসজিদ থেকে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আল-কারাউইয়্যিনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমদিকে এটি ছিল মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষাকেন্দ্র। পরে সেখানে বিভিন্ন শাস্ত্রে পাঠদান শুরু হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মধ্যযুগে এখানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনা করেছেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ইবনে খালদুনসহ খ্যাতিমান জ্ঞানী ও গবেষকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক ছিল।
মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনির গবেষণা অনুযায়ী, আনুমানিক ১১শ থেকে ১২শ শতকের মধ্যে আল-কারাউইয়্যিন একটি আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রূপ পেতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।
বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আলোচনায়আল-কারাউইয়্যিনকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের প্রাচীনতম চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে আধুনিক অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে কী বোঝানো হবে, তার ওপর এ ধরনের ঐতিহাসিক দাবির ব্যাখ্যা কিছুটা নির্ভর করে।
ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১০৮৮ সালে—আল-কারাউইয়্যিনের কয়েক শতাব্দী পর। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আল-কারাউইয়্যিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অবশ্য শুধু তার বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি উত্তর আফ্রিকা ও মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
সমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপির ভাণ্ডারআল-কারাউইয়্যিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এর ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারটির সঙ্গে মারিনিদ শাসনামলের সুলতান আবু ইনান ফারিসের প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের ইতিহাস যুক্ত।
বর্তমানে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে প্রায় ৪ হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি এবং বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগ্রহে কুফি লিপিতে লেখা প্রাচীন কোরআনের পাণ্ডুলিপি, ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’সহ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গ্রন্থ রয়েছে।
আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরবিশ শতকে আল-কারাউইয়্যিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। মরক্কোর রাজকীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে এর আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজও ফেজের ঐতিহাসিক নগরকেন্দ্রে আল-কারাউইয়্যিন মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘ শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আর এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ফাতিমা আল-ফিহরির নাম ইসলামের ইতিহাসে শিক্ষা ও জনকল্যাণে নারীর অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি; ICESCO; আল-কারাউইয়্যিন গ্রন্থাগার ও প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক