জমি কেনার আগে দলিলের সত্যতা ও বিক্রেতার মালিকানা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। দলিলে সরকারি সিল, স্বাক্ষর, স্ট্যাম্প বা নিবন্ধন নম্বর থাকলেই সেটিকে আসল এবং জমিটিকে ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দলিলটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছে কি না, সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মেলে কি না এবং বিক্রেতার বৈধ মালিকানা রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
জমির দলিল জাল হওয়া, একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, খতিয়ান ও দাগ নম্বরে অসংগতি কিংবা মালিকানার ধারাবাহিকতায় ত্রুটি থাকলে ক্রেতাকে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই শুধু মূল দলিল দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকারি নথি, জমির বাস্তব অবস্থান ও মালিকানার ইতিহাস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের তথ্য যাচাইদলিলের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখা। এ ক্ষেত্রে দলিল নম্বর, নিবন্ধনের সাল ও তারিখ, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম, জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ পরীক্ষা করতে হবে।
দলিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করে নিবন্ধনসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা যেতে পারে। হাতে থাকা দলিলের সঙ্গে সরকারি রেকর্ড থেকে পাওয়া অনুলিপির তথ্য তুলনা করলে অসংগতি শনাক্ত করা সহজ হয়।
নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট শর্তে সেগুলো পরিদর্শন বা অনুলিপি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়া গেলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব বিরোধের অবসান হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
খতিয়ান ও দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখুনদলিলে উল্লেখ করা খতিয়ান ও দাগ নম্বর সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। খতিয়ানে জমির রেকর্ডভুক্ত মালিক ও জমির বিবরণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, দাগ নম্বরের সাহায্যে মৌজা মানচিত্রে নির্দিষ্ট জমির অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
পুরোনো জমির ক্ষেত্রে বিভিন্ন জরিপে দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো দলিলের নম্বরের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের নম্বর না মিললে সংশ্লিষ্ট জরিপের তথ্য ও রেকর্ড যাচাই করতে হবে।
বিক্রেতার মালিকানা ও আগের দলিল পরীক্ষাকেউ দলিল দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করলেই তাঁকে বৈধ মালিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিক্রেতা কীভাবে জমিটির মালিক হয়েছেন, তা যাচাই করতে হবে। এ জন্য তাঁর মালিকানার দলিল, সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারির তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশসংক্রান্ত নথি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা পরীক্ষা করা উচিত। জমিটি একাধিকবার হাতবদল হয়ে থাকলে আগের দলিলগুলোর ধারাবাহিকতাও যাচাই করতে হবে।
নামজারি বা মিউটেশন ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তবে শুধু নামজারি সম্পন্ন হওয়াকে চূড়ান্ত মালিকানার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। দলিলের সত্যতা এবং জমির ওপর বিক্রেতার বৈধ অধিকার—দুটি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে মিলিয়ে নিনদলিলে জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে জমির অবস্থান ও সীমানা একই আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দলিল, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্রের তথ্যের সঙ্গে জমির বাস্তব অবস্থান মিলিয়ে দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ, মৌজা, দাগ নম্বর, চারপাশের সীমানা, রাস্তা ও সংলগ্ন জমির অবস্থান পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করানো যেতে পারে।
জমিতে অন্য কারও দখল, দাবি বা বিরোধ রয়েছে কি না, সেটিও খোঁজ নেওয়া জরুরি। কারণ কাগজপত্রের তথ্য সঠিক হলেও বাস্তব দখল ও সীমানা নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে।
বিক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত করুনদলিলে উল্লেখ করা বিক্রেতা এবং বাস্তবে জমি বিক্রি করতে আসা ব্যক্তি একই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিচয়পত্র, দলিল ও মালিকানার নথির তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিক্রেতা অন্য কারও প্রতিনিধি হলে তাঁর পক্ষে জমি বিক্রির বৈধ ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৩৪ ধারায় দলিল নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি ও দলিল সম্পাদনসংক্রান্ত বিষয় যাচাইয়ের বিধান রয়েছে।
কাটাছেঁড়া বা অস্বাভাবিক সংশোধনে সতর্কতাদলিলে অস্বাভাবিক কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা, ভিন্ন কালি, অস্পষ্ট নম্বর বা সন্দেহজনক সিল-স্বাক্ষর দেখা গেলে যাচাই না করে এগোনো উচিত নয়। তবে শুধু কাগজের চেহারা দেখে কোনো দলিলকে জাল বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। পুরোনো নথিতে স্বাভাবিকভাবেও কাগজের ক্ষয় বা কালি ও ছাপের পার্থক্য থাকতে পারে।
সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কি ঝুঁকি শেষ?দলিলে নিবন্ধন নম্বর থাকলেই জমি কেনার সব ঝুঁকি দূর হয় না। বিক্রেতার মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন, উত্তরাধিকারীদের দাবি, একই জমি নিয়ে বিরোধ, দখলসংক্রান্ত সমস্যা কিংবা জমির পরিমাণ ও সীমানায় অসংগতি থাকতে পারে।
তাই দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি মালিকানার ধারাবাহিকতা, সর্বশেষ ভূমি রেকর্ড, জমির বাস্তব অবস্থা এবং সম্ভাব্য বিরোধ পরীক্ষা করা জরুরি।
তথ্য না মিললে করণীয়দলিলের তথ্য ও সরকারি রেকর্ডের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেলে যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা পরিশোধ বা জমি কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা উচিত। প্রথমে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের নথি পরীক্ষা করে পার্থক্যের কারণ জানতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করে ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিতে হবে।
কোনো বিরোধ দেখা দিলে কী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে, তা বিরোধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট নথির ওপর নির্ভর করে।
জমি কেনার আগে যাচাইয়ের তালিকা১. দলিল নম্বর, নিবন্ধনের সাল ও তারিখ মিলিয়ে দেখা।
২. সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডে দলিলের তথ্য যাচাই করা।
৩. ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত করা।
৪. মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখা।
৫. বিক্রেতার মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা।
৬. সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারির তথ্য যাচাই করা।
৭. জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে মিলিয়ে দেখা।
৮. অন্য কারও দাবি, বিরোধ বা দখলসংক্রান্ত সমস্যা আছে কি না, খোঁজ নেওয়া।
৯. প্রয়োজন হলে সরকারি রেকর্ড থেকে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক