হৃদরোগকে সাধারণত বয়স্কদের অসুস্থতা মনে করা হলেও তরুণেরাও এ ঝুঁকির বাইরে নন। জন্মগত হৃদ্যন্ত্রের ত্রুটি, বংশগত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস অল্প বয়সেই হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ স্পষ্ট না হওয়ায় সময়মতো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মাত্র ৩৫ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার সিবুসিসিওয়ে গুগু মানকেলের মৃত্যুর ঘটনা তরুণদের হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-তথ্য ছাড়া সেটিকে নির্দিষ্ট হৃদরোগের ফল বলে ধরে নেওয়া যায় না।
দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল-এর বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে ২০২৪ সালে নিবন্ধিত মোট মৃত্যুর ১৭ দশমিক ৮ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল হৃদরোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগ। দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
তরুণদের যেসব হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছেহাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি: এটি একটি বংশগত রোগ, যাতে হৃদ্যন্ত্রের পেশি অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে রক্ত চলাচলে বাধা এবং বিপজ্জনক হৃদ্স্পন্দনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অ্যারিদমিয়া: হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতে গোলযোগ হলে হৃদ্স্পন্দন খুব দ্রুত, ধীরগতির বা অনিয়মিত হতে পারে। এর কিছু ধরন তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অন্যগুলো গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ: অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপ থাকে। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটি রক্তনালির ক্ষতি করে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মায়োকার্ডাইটিস: ভাইরাস সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে প্রদাহ হতে পারে। এতে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
জন্মগত হৃদ্ত্রুটি: হৃদ্যন্ত্রের গঠনগত কিছু ত্রুটি শৈশবে ধরা না পড়ে বড় হওয়ার পরও শনাক্ত হতে পারে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়অকারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি, স্বাভাবিক কাজের সময় শ্বাসকষ্ট, বারবার হৃদ্স্পন্দন অস্বাভাবিক মনে হওয়া এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি—এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়সে হৃদরোগ বা আকস্মিক হৃদ্মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
হঠাৎ তীব্র বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। এসব উপসর্গকে শুধু উদ্বেগ, মানসিক চাপ বা ক্লান্তি বলে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন জরুরিরক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে হৃদরোগের কিছু ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।
পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। তবে সবার জন্য একই ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; ব্যক্তির ঝুঁকি অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্ধারণ করাই যুক্তিযুক্ত।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তনহৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তামাক পরিহার গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, আস্ত ফল, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও প্রোটিনের উপযুক্ত উৎস রাখা উপকারী। অতিরিক্ত লবণ, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ কমানোও রক্তচাপ ও সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাঁদের হৃদরোগের উপসর্গ রয়েছে বা আগে থেকেই কোনো রোগ শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে, পানিশূন্যতা তৈরি করতে এবং হৃদ্স্পন্দনে অনিয়ম ঘটাতে পারে। তাই হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার পাশাপাশি বিপৎসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তরুণ বয়স মানেই হৃদরোগের ঝুঁকি নেই—এ ধারণা সঠিক নয়। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনায় রাখা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক