যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম আলোচিত নেতা ও নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বলয় এবং প্রভাবশালী লবিগুলোর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে মামদানির সমর্থিত তিন প্রগতিশীল প্রার্থী—ব্র্যাড ল্যান্ডার, ক্লেয়ার ভালদেজ এবং দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ারের বিজয় তার রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাকে ‘কিংমেকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল কেবল কয়েকজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং নিউইয়র্কে প্রগতিশীল রাজনীতির ক্রমবর্ধমান শক্তিরই প্রতিফলন। নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে ‘ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন’ এবং ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ)-এর স্লোগানও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামদানি ফিলিস্তিন ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তিনি নিউইয়র্কের ‘ইসরাইল ডে প্যারেড’-এ অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী প্রো-ইসরাইল লবিং সংগঠন এআইপিএসি (AIPAC)-এর সমালোচনা করেন। তার এ অবস্থান মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মামদানি প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি এমন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমর্থন করেন না যেখানে একটি ধর্মকে অন্য ধর্মের তুলনায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়—সেটি ইহুদি, মুসলিম কিংবা খ্রিস্টান রাষ্ট্রই হোক না কেন। তার এ বক্তব্য প্রগতিশীল ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির জনপ্রিয়তার ভিত্তি শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা ফিলিস্তিন ইস্যু নয়। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, আবাসন সংকট, শিশুযত্ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকেও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার প্রশাসনের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যেই সার্বজনীন শিশুযত্ন কর্মসূচির জন্য ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার রাজ্য তহবিল নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ৯ মিলিয়নের বেশি ডলার ক্ষতিপূরণ আদায়, ভাড়াটিয়াদের জন্য ৩১ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা এবং বড় অঙ্কের বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মামদানির নেতৃত্বে নিউইয়র্কে যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠছে, সেখানে ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টান, আফ্রিকান-আমেরিকান, আরবসহ বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ রয়েছে। এই বহুমাত্রিক জোট ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সময়ে মিশিগান, কলোরাডোসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও প্রগতিশীল ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের প্রার্থীদের উত্থান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরের নির্বাচনী রাজনীতিই নির্ধারণ করবে—জোহরান মামদানির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রগতিশীল ধারা সাময়িক রাজনৈতিক প্রবণতা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক