আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ায় গভীর সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। একই সঙ্গে তীব্র জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বন্দর-কাস্টমসের জটিলতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের পোশাক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানাগুলোতে। কার্যাদেশের অভাবে গত ছয় মাসে জেলায় ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সাত হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হওয়া ৫০টি কারখানার মধ্যে ২৫টি স্থায়ীভাবে এবং ২৫টি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় চালু থাকা অনেক কারখানাও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে গেছে, কোথাও ছুটি দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের তৈরি পোশাকশিল্পেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক।
কমেছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের বিভিন্ন বায়িং প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ১১০ কোটি ১৭ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৮৬৪ কোটি ৪৮ লাখ ইউরোর পোশাক।
গত বছরের একই সময়ে ইউরোপে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪ কোটি ৪৪ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও রপ্তানি কমেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪০০ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এতে এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বন্ধ কারখানায় বিপাকে শ্রমিক
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার আরটিটি টেক্সটাইল কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন শিরিনা বেগম। কারখানাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন পরিবার নিয়ে চরম অর্থকষ্টে রয়েছেন।
শিরিনা বলেন, অতিরিক্ত কাজসহ মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর সেই আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সন্তানদের নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার স্বামী রিকশাচালক এবং অসুস্থ হওয়ায় পরিবারের সংকট আরও বেড়েছে।
চট্টগ্রামের শান গার্মেন্টস, ওমামা ফ্যাশনসহ বিভিন্ন কারখানার অনেক শ্রমিকও চাকরি হারিয়েছেন। কেউ বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ পেশা পরিবর্তন করে অন্য খাতে কাজ নিচ্ছেন।
রুবেল নামে এক শ্রমিক জানান, দীর্ঘদিন পোশাক কারখানায় কাজ করার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ নিচ্ছেন। তার দাবি, প্রায় তিন বছর কাজ করলেও চাকরি হারানোর পর প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করা হয়নি।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সংকটও পোশাকশিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল কারখানাগুলো সংকটে পড়েছে। কার্যাদেশ কমে যাওয়ার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান বলেন, গত ছয় মাসে শ্রমিক ছাঁটাই, জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং বিনা নোটিশে চাকরি থেকে অব্যাহতির অভিযোগ বেড়েছে। দীর্ঘদিন কাজ করা অনেক শ্রমিকও আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সুপার মাহমুদা বেগম সোনিয়া বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ও কারখানা মালিকদের অভিযোগ নিয়ে শিল্প পুলিশ সমাধানের চেষ্টা করছে। কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে মালিকরা কাঁচামাল সংকট, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও আর্থিক সংকটের কথা জানিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আচরণকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো তুলনামূলকভাবে কটনভিত্তিক পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ম্যান-মেড ফাইবার বা এমএমএফ পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। এই পরিবর্তিত বাজার চাহিদার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারায় বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
ইউরোপের বাজারেও প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কিছু কার্যাদেশ হারিয়ে ইউরোপে প্রভাব বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ভিয়েতনাম ও ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক সুবিধার কারণে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
এর সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট, বন্দর ও কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘ লিড টাইমও রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চীন থেকে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কাঁচামাল পৌঁছাতে যেখানে ১৮ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে, সেখানে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম একই ধরনের কাঁচামাল পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে সংগ্রহ করতে পারে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার বেলায়েত হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তার আচরণ পরিবর্তন, দেশের জ্বালানি সংকট, ইউরোপে প্রতিযোগী দেশগুলোর বাণিজ্য সুবিধা এবং বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় ক্রেতারা বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দেশের কারখানাগুলোতে কাজ কমে যাচ্ছে। কোথাও উৎপাদন বন্ধ হয়েছে, আবার কোথাও আংশিক উৎপাদন চলছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস লিমিটেডের মালিক এসএম আবু তৈয়ব বলেন, বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল কারখানাগুলো বেশি সংকটে রয়েছে। কার্যাদেশ কমার পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সেলিম উদ্দিন বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বিদ্যমান বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা রক্ষা করতে হবে। উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিক ছাঁটাই বাড়বে এবং বেকারত্বের হারও বাড়তে পারে। এতে বৈদেশিক আয় ও সরকারের রাজস্ব—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, উৎপাদন সচল রাখতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সংকট সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বেশি দামে হলেও এলএনজি আমদানি করে উৎপাদনমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাকশিল্পের বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, এমএমএফ পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরি, কাঁচামাল সরবরাহের সময় কমানো, জ্বালানি নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতটিতে সংকট আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক