সরকারি নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআইয়ের ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর আইন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ডিপফেক ও অপতথ্য নিয়ে উদ্বেগআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও ও তথ্য বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যক্তি হয়রানি, মানহানি, সাইবার বুলিং এবং শিশুদের লক্ষ্য করে অপতৎপরতার মতো ঘটনাও রয়েছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, এআই ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের ঘটনাও নজরে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা ও উৎস যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনাস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, দেশে ডিজিটাল ও সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), গোয়েন্দা বিভাগ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও বিশেষায়িত গবেষণাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে ভিয়েনায় ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট’-এও তিনি এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্টের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে এআই-ভিত্তিক অপরাধ শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনএআইয়ের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে সরকার কাজ করছে। জুলাইয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি আইনটির খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার বিষয়ে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কমিটি তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়েও সুপারিশ দিয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনের উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা, অপতথ্য ও ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, অনলাইন জালিয়াতি, সেক্সটর্শন, ব্ল্যাকমেইল এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো অপরাধ মোকাবিলায় সময়োপযোগী আইন প্রয়োজন। পাশাপাশি আইন যাতে অপব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে সরকার।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগএআইয়ের অপব্যবহার ও দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও আলোচনা চলছে। অ্যানথ্রপিক নিরাপদ ও দায়িত্বশীল এআই উন্নয়নের জন্য ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোস্কি সাম্প্রতিক এক লেখায় ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় শক্তিশালী সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। ওপেনএআইও এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবীয় তদারকি, নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়বদ্ধতার প্রশ্নসরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারও সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ করে ভুয়া পরিচয়ে অশ্লীলতা ছড়ানো, নারী-শিশুকে হয়রানি, মানহানি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ দমন, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং আইনের অপব্যবহার রোধ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স