জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই সরবরাহে টান, বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর দেশের পণ্য পরিবহন ও নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দাম বাড়ার পর গত দুই দিন ধরে কয়েকটি কোম্পানি বাজারে নতুন করে পণ্য সরবরাহ করছে না। এতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

তবে ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন কোম্পানিগুলোর পণ্য সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর দেশজুড়ে পরিবহন সংকট তৈরি হওয়ায় সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

দুই দিন ধরে পণ্য সরবরাহ না দেওয়ার অভিযোগ

কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দিন বাবলু বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গত দুই দিনে কোনো কোনো কোম্পানি নতুন করে পণ্য সরবরাহ করেনি। তাদের প্রতিনিধিদেরও বাজারে দেখা যাচ্ছে না। এতে বাজারে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অনেকে বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছেন।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের তানজিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী তানজিম উদ্দিনও একই অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা আসার পর দুই দিন ধরে কোম্পানিগুলো পণ্য দিচ্ছে না।

নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, কোনো কোম্পানিই সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ায় না। বর্তমানে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সবজি পরিবহনে বাড়তি খরচ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে সবজি পরিবহনেও। কারওয়ান বাজারের আড়তদার খলিলুর রহমান জানান, ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় একটি ট্রাকের ভাড়া সাড়ে ১৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ একেকটি ট্রাকে পরিবহন খরচ বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের খুচরা সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, এক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা শাহানাজ বেগমের মতে, সব আড়তেই দাম বেড়েছে। তবে নতুন মৌসুমি সবজি বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু সবজি নয়—দূরবর্তী এলাকা থেকে ঢাকাসহ বড় শহরে চাল, মাছ, মাংস, ডিম, আলু ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ডিজেলনির্ভর যানবাহন ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়লে উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি এবং পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজার নজরদারির দাবি

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, বাজারে সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিলে তা অনৈতিক। সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরকারের কঠোর বাজার নজরদারি প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সিপিডির গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।

বেনাপোলে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বেনাপোল স্থলবন্দরেও ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানভেদে ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোয় হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। এতে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে বাড়তি খরচ যুক্ত হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এএসএম আহম্মেদ খোকন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিটি বাসে শুধু জ্বালানি বাবদ প্রায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাসভাড়া সমন্বয় করা হবে বলে জানান তিনি।

সরকারের বক্তব্য

সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কথা বলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে টিকাদান কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহের মতো সরকারি কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারত।

জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি তেলের দাম আবার সমন্বয় করে আগের পর্যায়ে বা তার চেয়েও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো বা অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পণ্যের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে পরিবারের দৈনন্দিন খরচও বাড়বে। আয় অপরিবর্তিত থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশি চাপে পড়তে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে জ্বালানি খাত থেকে সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্ব বা ভর্তুকিসংক্রান্ত সুবিধার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad