জীবনভর সুস্থ ফুসফুসের অঙ্গীকার

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৭ দুপুর
  • ৬৮৫২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমরা বাঁচি, কিন্তু সেই নিঃশ্বাসের উৎস ফুসফুসের কথা আমরা কতটুকু ভাবি? বিশ্ব ফুসফুস দিবস আমাদের সেই ভাবনাটাই মনে করিয়ে দিতে প্রতিবছর ফিরে আসে। প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব ফুসফুস দিবস। এর উদ্যোক্তা হলো Forum of International Respiratory Societies (FIRS)। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘A Lifetime of Lung Health’—জীবনভর ফুসফুসের সুস্থতা। এই প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। FIRS বলছে, ফুসফুসের স্বাস্থ্য এক দিনের বিষয় নয়, এটি সারা জীবনের যাত্রা।

দিবসটি উপলক্ষে দেশের বক্ষব্যাধির সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, যেমন সেমিনার, টিভি টকশো ও বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রোগ্রামের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেছে। এ ব্যাপারে বিএমআরসি পরিচালক ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সচিব ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননূর বলেন, ‘সুস্থ ফুসফুস মানেই প্রাণবন্ত জীবন। প্রতি নিঃশ্বাস আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য উপহার। একটি সচেতন সিদ্ধান্ত আপনার ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যকে বদলে দিতে পারে। যদি ধূমপান করেন, আজই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন

এদিকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ও বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের ট্রেজারার অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান বলেন, ‘সুস্থ ফুসফুসের জন্য শুধু রোগমুক্ত থাকাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাসই পারে আমাদের ফুসফুসকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন ও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সক্রিয় থাকুন। ফাঁকা ব্যায়াম বা খেলাধুলার মতো অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলুন। পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের প্রতিও গুরুত্ব দিন।’

ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, ‘পরিষ্কার বাতাস আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু বায়ুদূষণ আজ আমাদের ফুসফুসের জন্য একটি বড় হুমকি। ধোঁয়া, ধুলা ও ক্ষতিকর বায়ুকণা প্রতিদিন আমাদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে শিশু থেকে বড় সবার ওপরই প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ফুসফুস এখনো বিকাশমান। তাই তাদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী সবাই মাস্ক পরিধান করবেন। ধূমপান বর্জন করুন। যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া কমানোসহ পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করুন। বেশি বেশি করে গাছ লাগিয়ে সবুজ পরিবেশ তৈরি করাও আমাদের দায়িত্ব।’

বিশ্ব ফুসফুস দিবস উপলক্ষে দেশের অন্য একটি বক্ষব্যাধি সংগঠনের সভাপতি ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, “বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ফুসফুসের স্বাস্থ্য এবং ফুসফুসকে ভালো রাখার বিভিন্ন উপায় নিয়ে সেমিনার করছে। চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সেই ধারাবাহিকতায় চারটি সেমিনার এবং একটি র‍্যালি করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘A healthy lung of lifetime’—মানে সারাজীবন ফুসফুসকে সুস্থ রাখুন। এ জন্য আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, ধূমপান বর্জন করতে হবে, ধূমপানকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে, বায়ুদূষণ রোধ করতে হবে, পরিবেশদূষণ রোধ করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল হ্যাজার্ড—সেখানে গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া—সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া আমাদের সমন্বিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জনগণকে এ বিষয়গুলো জানাতে হবে। রাজনৈতিক কমিটমেন্টের মধ্যে এগুলোর বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন বর্তমান সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করেছে, এটার বাস্তবায়ন করতে হবে। বায়ুদূষণের জন্য আমাদের সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা হলো—যানবাহন, ইটভাটার ধোঁয়াসহ বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ সরকার পরিবেশ রক্ষা করার জন্য ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আমাদের সবাইকে এই গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে অংশ নিতে হবে। সবাইকে দুটি গাছ লাগাতে হবে এবং সেটিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমাদের পরিবেশ রক্ষা পাবে। এছাড়া আমরা ফুসফুসের রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য ভালো খাবার খেতে হবে। আমাদের ব্যায়াম করতে হবে। পরিবেশ যাতে সুন্দর থাকে, পরিবেশ যাতে নির্মল থাকে, এর জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।”

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক ডা. গোলাম সারোয়ার বিদ্যুৎ বলেন, ‘সারা বছর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দিন দিন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই ফুসফুস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে সারা জীবন সুস্থ ফুসফুস নিয়ে বাঁচতে হলে আজই নিজেকে সচেতন করুন। তাহলেই লাইফটাইম হেলদি লাং নিয়ে আমাদের বাঁচা সম্ভব।’

এছাড়া বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর আলী হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফুসফুস জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নীরবে আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে আমাদের শরীরে পৌঁছে দেয় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। তাই ফুসফুসের সুস্থতা মানেই স্বাভাবিক জীবনের ভিত্তি। কিন্তু বায়ুদূষণ, ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ফুসফুসের জন্য বড় ঝুঁকি। ফুসফুসের যত্ন শুরু করতে হবে আজ থেকেই। ধূমপান থেকে বিরত থাকুন এবং অন্য কেউ ধূমপানমুক্ত থাকতে উৎসাহিত করুন। ধুলা, ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন। দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।’

আসুন, বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬-এ অঙ্গীকার করি—প্রতিটি নিঃশ্বাস হবে বিশুদ্ধ, প্রতিটি ফুসফুস পাবে সারাজীবন যত্ন।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad