নির্ধারিত দাম ১,৮৩৭ টাকা, এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,৫০০ টাকায়

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ দুপুর
  • ১৯০৯ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
সরবরাহ সংকটের অভিযোগ আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত—দাম নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদারের দাবি

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট ও অতিরিক্ত দাম নিয়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। ব্যবসায়ীরা এর জন্য সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি থেকে শুরু করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বাজারে সংকটের প্রকৃত কারণ এবং আমদানি করা গ্যাসের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ টাকার বেশি

রাজধানীর এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর তিনি ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এর মধ্যে ৫০ টাকা ছিল সরবরাহ খরচ। ওই সময় সিলিন্ডারটির নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই গ্রাহক বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দাম নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

রাজধানীর হাতিরপুলের যে দোকান থেকে তিনি গ্যাস কিনেছিলেন, সেই বিক্রেতা বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তাঁর দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে প্রতি সিলিন্ডার কিনতে খরচ বেড়েছে। সর্বশেষ চালানে তাঁর প্রতি সিলিন্ডারের খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকা। তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান।

মিরপুরের এক বিক্রেতাও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা বলে জানিয়েছেন।

ডিলার পর্যায়েও বাড়তি দামের অভিযোগ

বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে ডিলারের প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে ভোক্তা পর্যায়ে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

কিন্তু ডিলারদের অভিযোগ, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সরবরাহ কমে গেছে। অনেকেই চাহিদার অর্ধেক গ্যাসও পাননি।

মুন্সীগঞ্জের এলপিজি বিক্রেতা জাকির হোসেন জানান, ২০ সেপ্টেম্বরের পর তিনি আর গ্যাস পাননি। নতুন চালান এলে প্রতি সিলিন্ডার কিনতে তাঁর খরচ পড়বে ২ হাজার ২০০ টাকা। তাঁর ভাষ্য, ডিলার পর্যায়েই দাম এত বেশি হলে খুচরা বিক্রেতাদের পক্ষে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন।

মুন্সীগঞ্জে গ্রিন এলপিজির ডিলার মোজাম্মেল জানান, ২৬ বছর ধরে ব্যবসা করলেও এমন সংকটে আগে পড়েননি। তাঁর অভিযোগ, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর কোম্পানিটি তাঁকে আর গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি। নতুন দাম নির্ধারণের পর অপারেটর প্রতি সিলিন্ডারের দাম চেয়েছে ১ হাজার ৯৯০ টাকা, যেখানে নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী তাঁর কেনার কথা ১ হাজার ৭৪২ টাকায়।

মোজাম্মেলের দাবি, সাধারণত মাসে ২০ হাজার সিলিন্ডার পর্যন্ত বিক্রি করলেও গত সেপ্টেম্বরে তিনি সর্বোচ্চ ২ হাজার সিলিন্ডারের গ্যাস পেয়েছেন। পরিবহন ব্যয়সহ বাড়তি খরচের কারণে প্রতি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অপারেটরদের বিরুদ্ধে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ

এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতি অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তুলে বিইআরসিকে লিখিত চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, নতুন দাম নির্ধারণের পর কোনো কোনো অপারেটর ডিলারদের কাছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চেয়েছে। অপারেটরভেদে ডিলারদের জন্য দাম ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে ২ টাকা কমেও সিলিন্ডার সরবরাহ করছে বলে চিঠিতে বলা হয়।

সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খানের দাবি, অপারেটরদের বাড়তি দাম ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন। নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে অনেক পরিবেশক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সেলিম খানের অভিযোগ, ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এসব কোম্পানির সিলিন্ডার ভরে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে সংকট কমতে পারে।

আমদানি অব্যাহত, তবু কেন সংকট

বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আমদানি হয়। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩২ থেকে ৩৩টি কোম্পানির লাইসেন্স থাকলেও গ্যাস আমদানি করছে ১০ থেকে ১২টি কোম্পানি।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার টন। আমদানির পরিমাণ কাছাকাছি থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট কেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গ্রিন এলপিজির মহাব্যবস্থাপক আহসান হাবিব হিরো জানান, তাঁদের কোম্পানি গত দুই বছর ধরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করছে না। অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে পরিবেশকদের সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সরবরাহকারীরাও প্রয়োজনীয় গ্যাস দিতে পারছেন না।

তাঁর ভাষ্য, সেপ্টেম্বর মাসে তাঁদের ২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পাওয়া গেছে। সরবরাহকারীরা গ্যাস দিতে না পারায় বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে কেনার চেষ্টা চলছে। এতে প্রতি সিলিন্ডারের খরচ ২ হাজার টাকার বেশি পড়তে পারে।

অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক আমদানির কোটা বাতিল এবং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাজারে গ্যাস সরবরাহের ব্যয় বেড়েছে।

আমিরুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও প্রিমিয়াম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তবে বাজারে কেউ গ্যাস মজুত করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অপারেটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামে বিক্রির আহ্বান জানানো হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

আন্তর্জাতিক বাজার ও বাড়তি চাহিদার প্রভাব

অপারেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় ও প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানায় এলপিজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকটে শিল্প খাতে এলপিজির চাহিদা বাড়ায় আমদানি অব্যাহত থাকলেও গৃহস্থালি বাজারে সংকট তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে গৃহস্থালি রান্নার গ্যাসের কেজিপ্রতি খরচ বেশি। তবে দেশভেদে আমদানি নীতি, পরিবহন ব্যয় ও ভর্তুকির পার্থক্যের কারণে দামে তারতম্য রয়েছে।

জবাবদিহি ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এলপিজি খাতে জবাবদিহি ও নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ভোক্তারা নির্ধারিত দামে গ্যাস পাচ্ছেন না। সরকারের নিজস্ব মজুত ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

এদিকে, নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করছেন এবং অভিযান পরিচালনা করছেন।

বিইআরসি জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে ভোক্তাদের জন্য নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া এখনো নিশ্চিত হয়নি।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad