মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে দেশগুলো। তবে চুল্লি উৎক্ষেপণ, অবতরণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা জানিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একই ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন প্রয়োজনবিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর আশপাশের কিছু গভীর গর্তে দীর্ঘদিন ধরে বরফ জমে রয়েছে। এসব স্থানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না বললেই চলে। বরফ থেকে পানি সংগ্রহের পাশাপাশি তা থেকে অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন তৈরি করা সম্ভব। হাইড্রোজেন রকেটের জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি, গবেষণাকেন্দ্র ও খনন প্রকল্প গড়ে উঠলে এসব উপাদানের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বরফ উত্তোলন, পানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ঘাঁটির যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি।
চাঁদের কোনো এলাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সূর্যের আলো না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন। এ কারণে পারমাণবিক চুল্লিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছে মহাকাশ গবেষণায় এগিয়ে থাকা দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনযুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’ থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চুল্লিটি রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই টানা পাঁচ বছর পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
চুল্লিটির ওজন ৬ হাজার কেজির নিচে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি রকেটের নির্দিষ্ট অংশে এটি বহন করা যাবে। এর জন্য ৩ দশমিক ৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের জায়গা প্রয়োজন হবে।
রাশিয়ার ‘সেলেনা’ চুল্লি, উৎপাদন ১০ কিলোওয়াটরাশিয়া ‘সেলেনা’ নামে একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করছে। এটি থেকে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই প্রায় ১০ বছর চালানোর উপযোগী করে এটি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চীন নেতৃত্বাধীন চন্দ্রঘাঁটিতে ২০৩৬ সালের দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য চুল্লিটি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সম্ভাব্য ওজন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত চুল্লির তুলনায় এটি অনেক হালকা হবে।
কীভাবে চাঁদে স্থাপন করা হবেপ্রথমে পৃথিবীতে চুল্লি তৈরি করবেন বিজ্ঞানীরা। এরপর রোবটচালিত মহাকাশযানের মাধ্যমে সেটি চাঁদে পাঠানো হবে। রকেট ইঞ্জিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করানো হবে, যাতে অবতরণের সময় ধাক্কা কম লাগে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদে পৌঁছানোর আগে চুল্লি চালু করা হবে না। এতে উৎক্ষেপণ ও যাত্রাপথে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
চাঁদে স্থাপনের পর চুল্লিগুলো দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হবে। সেখান থেকে গবেষণাকেন্দ্র, আবাসন এবং খননকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
সৌরবিদ্যুতের বদলে পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতাচাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের সন্ধান পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার আগ্রহ বেড়েছে। বরফ উত্তোলন করে পানি, অক্সিজেন ও রকেটের জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও চাঁদ থেকে খনিজ পদার্থ উত্তোলনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর পরিকল্পনায় অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ রয়েছে। এসব উপাদান ব্যবহার করে মহাকাশে উপগ্রহ তৈরির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের ব্যাংগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ আলজাজিরাকে বলেন, চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলচালিত ব্যবস্থা ব্যবহার করাও ব্যয়বহুল। কারণ, এসব সরঞ্জাম পৃথিবী থেকে চাঁদে নিয়ে যেতে হবে।
তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প। চাঁদের বরফ উত্তোলন ও ঘাঁটির বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে একসঙ্গে তিন থেকে চারটি পারমাণবিক চুল্লি চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।
মহাকাশে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাচাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের উদ্যোগের পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, ভূরাজনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। মহাকাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া প্রতিযোগিতা করছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে নাসাকে ২০৩০ সালের মধ্যে উৎক্ষেপণের উপযোগী চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে এবং চীনের সঙ্গে এ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে।
তবে সাইমন মিডলবার্গের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুল্লি তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উপযুক্ত যানবাহন, চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদ অবতরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে চুল্লি পরিচালনা করাই হবে কঠিন কাজ।
পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি কতটামহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। উৎক্ষেপণের সময় চুল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে চুল্লি চালুর আগে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস-৯৫৪’ নামের একটি উপগ্রহে পারমাণবিক চুল্লি ছিল। উপগ্রহটি ভেঙে পড়ার পর কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কারে ব্যয়বহুল অভিযান চালাতে হয়।
মিডলবার্গের মতে, চাঁদে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দূষিত এলাকার পরিসর তুলনামূলক সীমিত থাকতে পারে। তবে চুল্লি স্থাপন ও পরিচালনায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
চাঁদের মালিকানা নিয়ে আইনি প্রশ্ন১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি বা মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদ কিংবা এর কোনো অংশের ওপর সার্বভৌম মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে কোনো দেশ চাঁদে পাঠানো নিজস্ব সরঞ্জামের মালিকানা ধরে রাখতে পারে। চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।
লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি আলজাজিরাকে বলেন, চুক্তির নীতিমালা মেনে চললে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন আইনসম্মত হতে পারে। তবে মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং ক্ষতিকর দূষণ এড়িয়ে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
চাঁদের যেসব এলাকায় বরফের মজুত রয়েছে, সেখানে আগে পৌঁছানো দেশগুলো নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করতে পারে। এতে ওই এলাকার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলেও অন্য দেশের প্রবেশ ও কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সালমেরির মতে, নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করলেই কোনো দেশের ভূখণ্ডগত অধিকার তৈরি হয় না। তবে সেখানে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হলে তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কায় অন্য দেশগুলো ওই এলাকায় প্রবেশে অনাগ্রহী হতে পারে।
এ ছাড়া চাঁদে পারমাণবিক স্থাপনায় দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতির দায় কার ওপর বর্তাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রচলিত মহাকাশ আইন দীর্ঘমেয়াদে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনার সব পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধান, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ আহরণ এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলাই হবে এ অভিযানের বড় পরীক্ষা।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক