পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে কিংবা ভিডিও কলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেই রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত হয় না। বাংলাদেশে মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। শুধু নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা তৈরি করাও বিয়ের আইনগত নিবন্ধনের বিকল্প নয়। নিবন্ধন না থাকলে ভবিষ্যতে দেনমোহর, সম্পত্তির অধিকার ও উত্তরাধিকার দাবি করতে গিয়ে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন স্বামী-স্ত্রী।
দেশে অনেকেই পরিবারের সম্মতি ছাড়া পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে পালিয়ে যান। কেউ মসজিদে দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে করেন, আবার কেউ নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা তৈরি করেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন। কিন্তু যথাযথ নিবন্ধন না থাকলে পরবর্তী সময়ে বিয়ের আইনি স্বীকৃতি প্রমাণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আইনজীবী মো. শামসুদ্দোহা সুমনের মতে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। শুধু হলফনামা করে বিয়ের কোনো আইনি ভিত্তি তৈরি হয় না।
হলফনামা কি বিয়ের বিকল্প?নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা করে বিয়ের প্রচলন থাকলেও এটি বিয়ের আইনগত নিবন্ধনের বিকল্প নয়। বিশেষ করে বিয়ের নির্ধারিত বয়স পূর্ণ না হলে বয়স গোপন করতে কেউ কেউ এ পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। ২০১৯ সালে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং অবৈধ বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন বন্ধে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন নিষিদ্ধ করে নির্দেশনা জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।
বিয়ে নিবন্ধিত না থাকলে দেনমোহর, কাবিনের টাকা, সম্পত্তির অংশ কিংবা উত্তরাধিকার দাবি করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পরও বিয়ের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
শুধু তিনবার কবুল বললেই কি বিয়ে সম্পন্ন?ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে বর-কনের সম্মতি, সাক্ষীর উপস্থিতি এবং দেনমোহর নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হয়। তবে ধর্মীয়ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার স্বীকৃতি পাওয়া এক বিষয় নয়।
কাজী অফিস-সংশ্লিষ্ট আহসান উল্লাহ মাসুকের ভাষ্য, অনেকের ধারণা, কলেমা পড়ে বা তিনবার কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধন করাও জরুরি।
ভিডিও কলে বিয়েতে কী জটিলতা?বিদেশে অবস্থানরত বর বা কনের সঙ্গে ভিডিও কলে বিয়ের প্রচলন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইসলামি আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। কিছু আলেমের মতে, সাক্ষীরা বর-কনেকে শনাক্ত করতে পারলে এবং বিয়ের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে ভিডিও কলে সম্পন্ন বিয়ে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তবে ভিডিও কলে বিয়ে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। কাজী অফিস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের জন্য বর-কনের সরাসরি উপস্থিতি এবং নির্ধারিত কাগজপত্রে স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়। ফলে ভিডিও কলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও নিবন্ধনের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের সুযোগভিন্ন ধর্মের দুজন ব্যক্তি নিজ নিজ ধর্ম পরিবর্তন না করেও বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর অধীনে বিয়ে করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সিভিল রেজিস্ট্রার ও তিনজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বিয়েতে পুরুষের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর হতে হবে। এ ছাড়া উভয়ের জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকা যাবে না।
ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিবন্ধন নিশ্চিত করা জরুরি। এতে বিয়ের স্বীকৃতি, দেনমোহর ও উত্তরাধিকারসহ সংশ্লিষ্ট অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স