ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক হারবারে স্ট্যাচু অব লিবার্টির পাশ দিয়ে চলার সময় এমন একটি বৈদ্যুতিক নৌযানে চড়েন জলযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভেসেভের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা এরিক লাকম্যান। নৌযানটি কাছের একটি পর্যটকবাহী ফেরির যাত্রীদেরও কৌতূহলের কারণ হয়ে ওঠে।
হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তিতে পানির ওপর ভেসে চলবে
ভেসেভের তৈরি নৌযানে ব্যবহার করা হয়েছে হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তি। এতে নৌযানের তলায় ডানার মতো বিশেষ কাঠামো থাকে। গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অংশ পানির নিচে থেকে নৌযানের মূল কাঠামোকে পানির ওপরে তুলে ধরে। ফলে পানির সঙ্গে ঘর্ষণ ও বাধা কমে যায় এবং নৌযান দ্রুত ও মসৃণভাবে চলতে পারে।
এরিক লাকম্যানের ভাষ্য, গতি বাড়লে নৌযানটির মূল কাঠামো পানির প্রায় দেড় ফুট ওপরে উঠে আসে। এতে ঢেউয়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চলার পরিবর্তে যাত্রা অনেক বেশি মসৃণ হয়।
ব্যাটারির ওজন কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বৈদ্যুতিক নৌযান তৈরির অন্যতম বাধা ব্যাটারির ওজন। ব্যাটারি ভারী হওয়ায় নৌযানের মোট ওজন বেড়ে যায়। একই সঙ্গে পানির বাধা অতিক্রম করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। এতে নৌযানের চলার দূরত্ব ও কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তি এ সমস্যা কমাতে সহায়তা করে। নৌযানের বড় অংশ পানির ওপরে উঠে থাকায় ঘর্ষণ ও বাধা কমে যায়। ফলে তুলনামূলক কম শক্তি ব্যবহার করে বেশি গতিতে চলা সম্ভব হয়।
ভেসেভের দাবি, তাদের নকশায় পানির বাধা প্রায় ৬৬ শতাংশ কমানো সম্ভব। এতে ছোট ব্যাটারি ব্যবহার করেও নৌযান চালানো যায়, যা ব্যাটারির ওজন ও খরচ কমাতে সহায়ক।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে যাত্রী পরিবহনসেবা পরিচালনা করছে। অস্ট্রেলিয়ায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে লেক তাহো এলাকায় প্রথম সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে তারা।
সুইডেন-নরওয়েতেও বাড়ছে আগ্রহ
বৈদ্যুতিক হাইড্রোফয়েল নৌযান নিয়ে কাজ করছে সুইডিশ প্রতিষ্ঠান ক্যান্ডেলাও। স্টকহোমে তাদের তৈরি বৈদ্যুতিক হাইড্রোফয়েল ফেরিতে ইতোমধ্যে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রচলিত একই ধরনের নৌযানের তুলনায় তাদের প্রযুক্তিতে শক্তি খরচ সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
উপকূলীয় পরিবহনসেবার জন্য নরওয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ২০টি বৈদ্যুতিক হাইড্রোফয়েল নৌযান নেওয়ার আদেশ দিয়েছে।
সান ফ্রান্সিসকোতে ৫০ কোটি ডলারের প্রকল্প
যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতেও বৈদ্যুতিক ফেরি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শহরটির সবচেয়ে বড় ফেরি পরিচালনাকারী সংস্থা বছরে প্রায় ৩৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। সংস্থাটির বহরে বর্তমানে ১৮টি ফেরি রয়েছে, যার সবই জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত।
সংস্থাটির প্রধান সীমাস মারফি জানিয়েছেন, আগামী দুই বছরে বহরে চারটি ব্যাটারিচালিত ফেরি যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বৈদ্যুতিক রূপান্তর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ফেরিঘাটে চার্জ দেওয়ার অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে।
তবে সান ফ্রান্সিসকোর নতুন ফেরিগুলোতে আপাতত হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে না। সংস্থাটির দাবি, এগুলো চালু হলে যুক্তরাষ্ট্রে তারাই হবে প্রথম সংস্থা, যারা উচ্চগতির সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ফেরি পরিচালনা করবে।
প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি, দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ের আশা
বৈদ্যুতিক ফেরি চালুর ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো প্রাথমিক বিনিয়োগ। নতুন নৌযান কেনার পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণেও বিপুল অর্থ প্রয়োজন। তবে বৈদ্যুতিক মোটর সাধারণত ডিজেল ইঞ্জিনের তুলনায় বেশি দক্ষ। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমতে পারে।
সীমাস মারফির মতে, শুরুতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সময়ের সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমে আসবে। ডিজেলের বাড়তি দাম ও ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতি বৈদ্যুতিক ফেরির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।
তবে সব নৌপথে এ প্রযুক্তি সমানভাবে কার্যকর হবে না। দীর্ঘ দূরত্ব, ব্যস্ত সময়সূচি, ব্যাটারির ওজন ও দাম এবং দ্রুত চার্জ দেওয়ার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। তাই নৌযানের চলার দূরত্ব, যাত্রী ধারণক্ষমতা, সময়সূচি ও চার্জিং সুবিধা বিবেচনা করেই এ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারলে ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক ফেরি শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়, বরং বাস, পাতালরেল ও ট্যাক্সির মতো নিয়মিত গণপরিবহনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এতে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জলপথে দূষণ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখবে এ প্রযুক্তি।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স