বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের চরামদ্দি গ্রামের মিয়া বাড়ির হাট সংলগ্ন এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চার শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী—ঐতিহাসিক মুগা খান জামে মসজিদ। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই মসজিদ আজও ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মসজিদটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বরিশালের প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইসমাইল চৌধুরীর পরিবারের আদি পুরুষ মুগা খানের নাম জড়িত। ধারণা করা হয়, মুঘল আমলের শেষভাগে তাঁর উদ্যোগেই মসজিদটি নির্মিত হয়। সেই থেকে চরামদ্দি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে এ স্থাপনাটি।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ইট, চুন ও সুরকির সমন্বয়ে নির্মিত। এর খিলান, দেয়ালের অলংকরণ এবং নির্মাণশৈলীতে মুঘল স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা যায়। মসজিদের অভ্যন্তরে পবিত্র কোরআনের আয়াতের মনোরম লিপিকর্ম দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
ক্রমবর্ধমান মুসল্লির সংখ্যা ও সময়ের চাহিদা বিবেচনায় ২০১৭ সালে মসজিদটির সম্প্রসারণ ও সংস্কারকাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের শেষ দিকে তা সম্পন্ন হয়। সংস্কারের সময় মূল স্থাপত্যের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি হেফজ মাদরাসা ও একটি কওমি মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে, যা ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
মুগা খান জামে মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতি জুমা ও দুই ঈদের নামাজে এখানে বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও স্থাপত্যপ্রেমীরাও এই প্রাচীন নিদর্শন দেখতে নিয়মিত আসেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তাদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, তথ্যফলক স্থাপন, গবেষণাভিত্তিক পরিচিতি এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মুগা খান জামে মসজিদ দক্ষিণাঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
ঐতিহ্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় গুরুত্বের অনন্য সমন্বয়ে মুগা খান জামে মসজিদ আজও বাকেরগঞ্জের গর্ব, যা অতীতের গৌরবকে ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক