কর্মজীবী নারীর প্রতিদিনের মানসিক সংগ্রাম

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
সকাল ৬টা। অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই মাথায় ঘুরতে থাকে দিনের অসংখ্য হিসাব—সন্তানের টিফিন, স্বামীর নাশতা, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ, গৃহকর্মীর আসা-না আসা, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, জমা দেওয়ার রিপোর্ট, বিকালের বাজার কিংবা রাতের রান্না। পরিবারের সবার প্রস্তুতি নিশ্চিত করে নিজের জন্য কয়েক মিনিট সময়ও না নিয়ে ছুটতে হয় কর্মস্থলে।

অফিসে তিনি দক্ষ কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যাংকার, প্রকৌশলী কিংবা উদ্যোক্তা। সেখানে প্রতিদিন তাকে নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারত্ব প্রমাণ করতে হয়। দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরলেও বিশ্রামের সুযোগ নেই। কারণ, তখন শুরু হয় আরেক দফা দায়িত্ব—সংসার।

এভাবেই একজন কর্মজীবী নারীর প্রতিদিন যেন দুটি পূর্ণকালীন চাকরির সমান। পার্থক্য হলো, অফিসের কাজের জন্য তিনি বেতন পান; কিন্তু ঘরের অধিকাংশ শ্রমের নেই কোনো আর্থিক মূল্যায়ন, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা নির্ধারিত বিশ্রাম।

দ্বৈত দায়িত্বের অদৃশ্য চাপ

শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, গবেষণা, ব্যবসা, শিল্প ও প্রযুক্তিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি তারা পরিবারকেও আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পরও অধিকাংশ নারী সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাননি। বরং চাকরির পাশাপাশি আগের প্রায় সব গৃহস্থালির কাজও তাদের কাঁধে রয়ে গেছে।

একজন পুরুষ অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম নিলে তা অনেক সময় স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী অফিস শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে চাইলে তাকে শুনতে হয়—‘এত ক্লান্ত হওয়ার কী আছে?’ কিংবা ‘সংসারের কাজ তো করতেই হবে।’

এ ধরনের সামাজিক প্রত্যাশা ধীরে ধীরে নারীর মানসিক চাপ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এ চাপ উদ্বেগ, অবসাদ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অদৃশ্য মানসিক শ্রমের হিসাব নেই

সংসারের কাজ শুধু রান্না কিংবা ঘর পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের কার কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, কোন বিল কবে পরিশোধ করতে হবে, সন্তানের স্কুলের কার্যক্রম ও পরীক্ষার সময়সূচি, বাজারের তালিকা, আত্মীয়দের খোঁজখবর কিংবা উৎসবের প্রস্তুতি—এসব পরিকল্পনা ও মনে রাখার দায়িত্বও অনেক পরিবারে নারীর ওপর থাকে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের দায়িত্বকে মানসিক শ্রম বলা হয়। এর কোনো দৃশ্যমান স্বীকৃতি না থাকলেও এসব বিষয় সামলাতে মস্তিষ্ককে সারাক্ষণ সক্রিয় রাখতে হয়। ফলে বিশ্রামের সময়েও মন পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না।

একজন মানুষ শারীরিকভাবে বসে থাকলেও মানসিকভাবে অবিরাম কাজ করতে পারেন—মানসিক শ্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এটিই।

কর্মক্ষেত্রেও চাপ কম নয়

অফিসে যাওয়া অনেকের কাছে নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক মনে হলেও কর্মক্ষেত্রেও তাকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, নতুন দক্ষতা অর্জন, সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, পদোন্নতির প্রত্যাশা, চাকরির নিরাপত্তা ও নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের চাপ—সব মিলিয়ে কর্মজীবনও কম কঠিন নয়।

অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বৈষম্যের শিকার হন। তাদের পেশাগত দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়। মাতৃত্ব কিংবা সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বকে কখনো কখনো পেশাগত অঙ্গীকারের ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়। অথচ একই পরিস্থিতিতে পুরুষদের সামাজিক মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।

নিখুঁত হওয়ার অদৃশ্য চাপ

সমাজ নারীর সামনে এমন একটি আদর্শ দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তাকে একই সঙ্গে আদর্শ মা, আদর্শ স্ত্রী, দায়িত্বশীল পুত্রবধূ, সফল কর্মী এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ হতে হয়।

কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। তবু অনেক নারী অজান্তেই এই অসম্ভব মানদণ্ড পূরণের চেষ্টা করেন। ফলে কোনো একটি ক্ষেত্রে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই তৈরি হয় অপরাধবোধ।

অফিসে বেশি সময় দিলে মনে হয় সন্তানের প্রতি অবহেলা করছেন। আবার সন্তানের জন্য বেশি সময় ব্যয় করলে মনে হয় কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়ছেন। এই দ্বন্দ্ব ক্রমেই মানসিক ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়।

নিজের জন্য সময় কোথায়?

দিন শেষে বিছানায় যাওয়ার পরও পরদিনের কাজের পরিকল্পনা মাথায় ঘুরতে থাকে। বছরের পর বছর অনেক নারী নিজের শখ, বই পড়া, ভ্রমণ, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিছক বিশ্রামের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

ধীরে ধীরে তারা নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ও হারিয়ে ফেলতে পারেন। একসময় একজন মানুষ হিসেবে তার পরিচয়ের চেয়ে দায়িত্বের ভারটাই বড় হয়ে ওঠে।

সমাধান নারীর একার দায়িত্ব নয়

এই পরিস্থিতির সমাধান নারীদের আরও শক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তন।

সংসার কোনো একজনের দায়িত্ব নয়—এটি পরিবারের সবার। রান্না, সন্তান লালন-পালন, বাজার করা কিংবা ঘরের অন্যান্য কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া সুস্থ পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হওয়া উচিত।

একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। নমনীয় কর্মঘণ্টা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং বৈষম্যহীন কর্মসংস্কৃতি এখন সময়ের দাবি।

নিজের যত্নও অপরিহার্য

একজন কর্মজীবী নারী নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকে নজর না দিলে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তিনিই হবেন।

তাই পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সুস্থ জীবনের অপরিহার্য অংশ।

নিজেকে ভালো রাখা পরিবারকে ভালো রাখারও পূর্বশর্ত।

একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের পরিচয় শুধু নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা নয়। তার মানসিক সুস্থতা, মর্যাদা, বিশ্রাম এবং ব্যক্তিসত্তার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারীর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া তাই কেবল পারিবারিক সহায়তা নয়, বরং একটি ন্যায়সংগত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠারও অংশ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad