ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক সংকট কাটেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠনের পর গোপন খেলাপি ঋণ সামনে আসায় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। দুই বছরেও খেলাপি ঋণ আদায়, প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও লোকসান কমাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
ব্যাংকটির আর্থিক সূচকের অবনতির পাশাপাশি বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের অভিযোগও উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে এসব অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকটিতে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইএফআইসি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হারান সালমান এফ রহমান। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে।
নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকের গোপন খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করা হয়। এতে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। তবে এরপরও ঋণ আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার কোটি টাকাব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৩ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ উদ্ঘাটনের পর এর সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা ৬১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এরপর কমার পরিবর্তে তা আরও বেড়েছে।
গত জুন শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের হিসাবে এর হার ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
বেনামি প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকাব্যাংক সূত্র জানায়, খেলাপি হয়ে যাওয়া এসব ঋণের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা অস্তিত্বহীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো জামানতও নেই। এগুলো সালমান এফ রহমানের ‘বেনামি কোম্পানি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ঋণগ্রহীতাদের অধিকাংশই বর্তমানে কারাগারে অথবা পলাতক। ফলে তাদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা এসব ঋণের বড় অংশই এখন ব্যাংকে ফেরত আসছে না।
প্রভিশন ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৩ কোটিখেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণেও চাপে পড়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের জুন শেষে এ ঘাটতি ছিল মাত্র ৫০৫ কোটি টাকা।
প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংকটির মূলধনে ২৬৭ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল।
সম্প্রতি প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি কমাতে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটি জানিয়েছে, এই ঘাটতি কমাতে তাদের ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হবে।
প্রথমার্ধে পরিচালন লোকসান ১,৬৬৮ কোটিখেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিপুল প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি এবং সুদ থেকে আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংকটির লোকসানও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে আইএফআইসি ব্যাংক ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান করেছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর ব্যাংকটির নিট লোকসান গত বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছিল। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির লাভ ছিল ৬৩ কোটি টাকা।
পর্ষদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নবাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির গোপন খেলাপি ঋণ শনাক্ত হওয়ার পর দায়িত্ব ছিল খেলাপি ঋণ কমানো এবং অন্যান্য আর্থিক সূচকের উন্নতি করা। কিন্তু বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে উন্নতির উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ নেই। বরং আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পর্ষদ ও চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কার্যক্রম শিগগির মূল্যায়ন করা হবে। মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট পর্ষদ বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং ব্যাংকের আর্থিক সূচকের অবনতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে ব্যাংকের মুখপাত্র হেলাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক