চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জোরারগঞ্জ–আবুরহাট সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যে সরকার ও সংসদ সদস্য পরিবর্তনের পাশাপাশি একাধিকবার ঠিকাদার বদল এবং কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবু সড়কটির কাজ শেষ না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকেরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির উন্নয়নকাজ ২০২২ সালে শুরু হয়। দুই পাশে প্রশস্তকরণ ও সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও শুরু থেকেই নানা জটিলতায় কাজ বারবার বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৪ টাকা ৬৮ পয়সা। চুক্তির কার্যকাল ছিল ২৪০ দিন। চুক্তিপত্রে কাজ শুরুর তারিখ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং সমাপ্তির তারিখ ১৫ আগস্ট ২০২৫ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে ১২ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত করা হলেও বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সর্বশেষ বর্ধিত সময় শেষ হওয়ার পর আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মিরসরাই উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বারবার ঠিকাদার পরিবর্তনএলজিইডি সূত্র জানায়, এর আগেও সড়কটির কাজ নিয়ে ঠিকাদার পরিবর্তন ও সময় বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে বিটুমিনসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে এক ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যান। পরে তার কার্যাদেশ বাতিল করে কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তীতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হলেও কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বর্তমানে সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত, কাদা ও পানি জমে থাকায় যান চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সড়কের পশ্চিম গোপিনাথপুর অংশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ওই অংশে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের প্রয়োজন হওয়ায় বর্ষার কারণে কাজ আরও বিলম্বিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ক্ষোভস্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী মেহেদী হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের সংস্কারকাজ অসমাপ্ত থাকায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। পাঁচ বছরেও গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়া দুঃখজনক।
তেমুহনী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জমির উদ্দিন বলেন, এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী যাতায়াত করেন। দীর্ঘদিন কাজ শেষ না হওয়ায় তাদের নিয়মিত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সমাজকর্মী মাসুকুল আলম সোহান বলেন, জোরারগঞ্জ, ইছাখালী, কাটাছড়া ও আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ সড়কটি ব্যবহার করেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল আমিন জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন আর সময় বাড়ানোর আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান অগ্রগতির মাধ্যমে কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
কাজ না করলে চুক্তি বাতিলউপজেলা প্রকৌশলী সাফায়েত ফারুক চৌধুরী বলেন, তিনি মিরসরাইয়ে যোগদানের আগেই সড়কটির টেন্ডার হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় পুনঃদরপত্র করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন ঠিকাদারও কাজ উদ্বোধনের পর তা ফেলে রেখেছে। সর্বশেষ ঠিকাদার কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে। কাজ শুরু না করলে চুক্তি বাতিলের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এলজিইডি। কাজটি শেষ হলে একদিকে ঠিকাদার বড় ধরনের জরিমানা থেকে রেহাই পাবেন, অন্যদিকে জনসাধারণও দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন।
এদিকে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল আমিন সড়কটি পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
জোরারগঞ্জ–আবুরহাট সড়কটি জনবহুল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। মহাসড়ক থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে কাজ ঝুলে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। পাঁচ কিলোমিটারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ শেষ করতে কেন এত সময় লাগছে এবং ঠিকাদার পরিবর্তন ও কাজের অগ্রগতি তদারকিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক