ওয়াশিংটনে বদলাচ্ছে সমীকরণ: ইসরাইলের নিঃশর্ত মার্কিন সমর্থনের যুগ কি শেষের পথে?
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম স্থায়ী বৈশিষ্ট্য ছিল ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের দৃঢ় ও প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, জনমতের পরিবর্তন এবং উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থানের রূপান্তর ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই দীর্ঘদিনের সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসরাইল-নীতিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশের পাশাপাশি রিপাবলিকানদের একটি অংশও এখন ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক সিটির কংগ্রেসনাল প্রাইমারি নির্বাচনে কয়েকজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে এবং গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ফিলিস্তিন প্রশ্নে সহানুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সমাবেশে ‘ফ্রি ফ্রি ফিলিস্তিন’ স্লোগানও এই পরিবর্তিত জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, অতীতে যেখানে ইসরাইলের সমালোচনা রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে এখন নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর কাছে এটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে উঠছে।
মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি লবিং দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব লবিং কার্যক্রমও আগের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিছু প্রগতিশীল নেতা প্রকাশ্যে এসব লবিস্ট সংগঠনের সমালোচনা করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে তাদের প্রভাব সীমিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও ভিন্ন ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাসী একটি অংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে কেবল মার্কিন জাতীয় স্বার্থই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তাদের মতে, ইসরাইলের স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সব সময় এক নয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বিভিন্ন বক্তব্যে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মিত্র দেশের সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে বিদ্বেষ হিসেবে দেখা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অবশ্যই নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই হওয়া উচিত।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান-সংক্রান্ত কূটনৈতিক উদ্যোগও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেকেই ইসরাইলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন না।
রিপাবলিকান ঘরানার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ভাষ্যকার ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বও সম্প্রতি ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।
জনমত জরিপেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, বিশেষ করে তরুণ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে ইসরাইলের বর্তমান নীতির প্রতি সমর্থন আগের তুলনায় কমেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পুনর্বিবেচনার পক্ষে মতও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যাচ্ছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, একসময়ের প্রশ্নাতীত রাজনৈতিক ঐকমত্য এখন আর আগের অবস্থায় নেই। ইসরাইল ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক, নতুন মতপার্থক্য এবং নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ গঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীতিতে পরিবর্তনের যে ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তা আগামী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক