গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে সম্মান জানিয়ে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের রায়কে যারা অবজ্ঞা করেছে, ইতিহাসে তাদের কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। তাই দেরি হলেও সরকারের উচিত গণভোটের রায় মেনে নেওয়া।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের মিরপুর অঞ্চল আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’-এর দাবিতে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার যে রায় দিয়েছেন, তা অস্বীকার করা জনগণের মতামতকে অসম্মান করার শামিল। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “জনগণকে সম্মান করলে জনগণও আপনাদের সম্মান করবে। কিন্তু দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে জনগণের রায় অগ্রাহ্য করলে জনগণ অতীতের মতো ভবিষ্যতেও কাউকে ছাড় দেবে না।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার নিজেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। অথচ নির্বাচনের পর সেই গণভোটকেই অবৈধ বলা হচ্ছে। তার ভাষায়, “যদি গণভোট অবৈধ হয়, তাহলে একই প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? এই অবস্থান পরস্পরবিরোধী।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনগণের অধিকার আদায়ে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণের মুক্তি এবং ফ্যাসিবাদের শেষ চিহ্ন বিলীন না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্নের দাবি
জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হয়ে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। তিনি সরকারকে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা জীবন ও ত্যাগের বিনিময়ে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করেছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, নিহত, গুম, নির্যাতিত ও নিপীড়িতদের পরিবার এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মানিত করা, ইতিহাস ও পাঠ্যপুস্তকে তাদের অবদান যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আহতদের পুনর্বাসনের আহ্বান
আন্দোলনে আহতদের ‘জীবন্ত শহীদ’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না। তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, সম্মানজনক পুনর্বাসন এবং চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারকে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিজ নির্বাচনি এলাকার আন্দোলনকারীদের স্মরণে মিরপুরের বিভিন্ন সড়ক ও স্থাপনার নামকরণের প্রস্তাবও দেন তিনি। পাশাপাশি রাজধানীর নাগরিক সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে’
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, দেশের ইতিহাসে গণভোটের রায় উপেক্ষার নজির নেই। তিনি দাবি করেন, এ রায় বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজধানীর ময়লা ব্যবস্থাপনা, মাদক, নিরাপত্তাহীনতা ও সড়কের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি দ্রুত সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান।
সরকারের প্রতি সংবিধান সংস্কারের আহ্বান
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেম আরমান বলেন, সময় থাকতে জনগণের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় সরকারকে এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এছাড়া জনসভায় বক্তব্য দেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ড. মাহফুজুর রহমান, ইয়াছিন আরাফাত এবং প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকারসহ অন্যান্য নেতারা।
জনসভা শেষে জুলাই বিপ্লবের স্মরণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার