জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
নিকোলাস বিশ্বাস

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আবারও বিশ্বকে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে—জলবায়ু দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। এটি দেশ, অর্থনীতি কিংবা কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বিবেচনা করে আঘাত হানে না। বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, অনেক সময় তারাই সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়।

নেপাল এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশটির অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই চরম আবহাওয়া মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। ধ্বংস হতে পারে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা।

হিমালয়ঘেরা নেপালের এই ঝুঁকির মাত্রা আরও গভীর। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার অংশ হওয়ায় দেশটি বিপুল হিমবাহ ও বরফের আধার। এ কারণেই হিমালয় অঞ্চলকে অনেক সময় ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। এর প্রভাব শুধু পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; পানি নিরাপত্তা, কৃষি এবং হিমালয়-নির্ভর নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জীবনও এর সঙ্গে যুক্ত।

হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে পানির প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে অস্থিতিশীল হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদ হঠাৎ ভেঙে পড়লে নিচের জনপদে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ বন্যা। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের অব্যাহত ক্ষয় নদীর পানিপ্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতাকেও সংকটে ফেলতে পারে। অর্থাৎ হিমালয়ের উঁচু পাহাড়ে যে পরিবর্তন শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব পড়তে পারে বহু দূরের মানুষের জীবনেও।

সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালের মানুষের দুর্ভোগের চিত্র ইতোমধ্যে বিশ্ববাসীর সামনে এসেছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, বিপজ্জনক বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। কোথাও পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও ভেসে গেছে ঘরবাড়ি; আবার কোথাও পুরো জনপদকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে নামতে হয়েছে। এ দুর্যোগ শুধু সম্পদ ধ্বংস করেনি, মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাবোধও কেড়ে নিয়েছে।

দ্য হিন্দু-এর ‘Nepal Flash Floods Aftermath Live Report’-এ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। এ পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ১১ হাজার ৯৯৩ জনকে উদ্ধার করেছে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি করে পরিবার, জীবন ও জীবিকার বিপর্যয়ের গল্প।

জলবায়ু পরিবর্তনের অসম দায়

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অবিচার এখানেই—সংকটে যাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম, ক্ষতির বোঝা অনেক সময় তাদের ওপরই বেশি পড়ে। দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় ভূমিকা রেখেছে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বৃহৎ অর্থনীতির জোট জি২০ ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল।

অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশ বৈশ্বিক নিঃসরণে সামান্য অবদান রেখেও জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—যে সংকট তৈরিতে কয়েকটি দেশের ঐতিহাসিক ও বর্তমান অবদান বেশি, সেই সংকটের ক্ষয়ক্ষতির ব্যয় কি সবার ওপর সমানভাবে বর্তাবে?

এ কারণেই জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের প্রশ্নও। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বহু বছরের উন্নয়ন-অর্জনকে বিপর্যস্ত করেছে। রাস্তা, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারের জন্য একটি ঘর বা জীবিকা হারানোর অর্থ হতে পারে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ।

দুর্যোগের প্রভাব আবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদন কমে যায় এবং পুনর্গঠনের ব্যয় বাড়ে। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ সরিয়ে পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়।

সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে ঝুঁকি

জলবায়ু দুর্যোগের কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা নেই। বায়ুমণ্ডলও কোনো দেশের সীমানা মেনে চলে না। একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে মিশে পুরো পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ায়। এর প্রভাব প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার বিশেষ দায়িত্বও রয়েছে। জলবায়ু ন্যায্যতার মূল প্রশ্নটি এখানেই।

নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন ব্যবস্থা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি গড়ে তোলা জরুরি। তবে শুধু অভিযোজন দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে অভিযোজনেরও একটি সীমা রয়েছে। তাই মূল কারণ—গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ—কমাতে বৈশ্বিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সতর্কবার্তা

নেপালের অভিজ্ঞতা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের দেশগুলো বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো আন্তঃসীমান্ত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি।

হিমালয়ে সংঘটিত পরিবর্তন নিম্নাঞ্চলের নদীব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। একটি দেশের দুর্যোগ অন্য দেশের মানুষের জন্যও বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা—দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদী ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বিত উদ্যোগ।

একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সরাসরি অর্থায়ন ও কার্যকর কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

জলবায়ু মোকাবিলার উদ্যোগ কেবল বক্তৃতা ও ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বন্যা ও গলতে থাকা হিমবাহের মুখোমুখি মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকা, সহজলভ্য অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সংহতি।

নেপালে বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের দৃশ্য তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবি নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা। প্রতিটি মৃত, নিখোঁজ কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার ও একটি জীবনের গল্প।

নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের কার্বন নিঃসরণ সামান্য হলেও তার জলবায়ু ঝুঁকি বিপুল হতে পারে। বিপরীতে, বেশি নিঃসরণকারী জি২০ দেশগুলোর উচিত ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো। জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য এটি শুধু নৈতিক দায় নয়, আন্তর্জাতিক দায়িত্বও।

জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু এর ঝুঁকি অসম। নেপালের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা বিপর্যয় আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, নদী ও বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থা পৃথিবীর সব দেশকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে।

তাই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। একইভাবে দুর্যোগ প্রতিরোধ, মোকাবিলা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষার দায়িত্বেরও কোনো সীমান্ত থাকা উচিত নয়। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সংহতি।

জলবায়ু ন্যায্যতা কোনো দয়া বা দান নয়; এটি বিশ্বের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তের নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তবে জলবায়ু মোকাবিলার অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সহযোগিতাকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।

নেপালের বন্যাকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা—পরিবর্তিত জলবায়ুর অভিঘাত থেকে কোনো দেশ একা নিরাপদ থাকতে পারে না। একইভাবে এই সংকটের পরিণতি মোকাবিলায় কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দেশকেও একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস, মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad