অডিটের সংখ্যা নয়, গুণগত মান বাড়ানোই এখন আইসিএবির অগ্রাধিকার

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৮ দুপুর
  • ২০০২ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
দেশের আর্থিক খাতে অডিট রিপোর্টের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে এর গুণগত মান ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট সাব্বীর আহমেদ এফসিএ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অডিটরদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা অবকাঠামোও প্রস্তুত করতে হবে।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এফআরসির চেয়ারম্যান পদে সরকারি আমলা বা শিক্ষক নয়, পেশাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং স্বার্থের সংঘাত নেই—এমন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

সম্প্রতি ‘আমার দেশ’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আইসিএবি প্রেসিডেন্ট। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাওসার আলম।

আর্থিক সুশাসনে আইসিএবির ভূমিকা

সাব্বীর আহমেদ বলেন, আইসিএবিকে অনেকে শুধু অডিটরদের সংগঠন মনে করলেও প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ‘দ্য বাংলাদেশ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অর্ডার, ১৯৭৩’-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পেশাদার হিসাববিদ ও নিরীক্ষা কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি অডিট ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় রেখে আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইসিএবি ভূমিকা রাখছে।

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও অডিট ফার্মের চাহিদাও বাড়ছে। তবে শুধু সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে দক্ষতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) ব্যবস্থায় কাজ করছে। ফলে অডিটরদেরও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। পাশাপাশি নিয়মনীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন সম্পর্কেও নিয়মিত জ্ঞান অর্জন জরুরি।

এআই ব্যবহারে প্রয়োজন প্রস্তুতি

অডিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার প্রসঙ্গে আইসিএবি প্রেসিডেন্ট বলেন, বিপুল পরিমাণ ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর আগে ব্যবসায়িক ডেটাকে নির্ভুল ও ব্যবহারোপযোগী করতে হবে।

ডেটা সঠিক না হলে এআইয়ের মাধ্যমে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর ফলাফল পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহারের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শিক্ষার্থী ও অডিটরদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

ডিভিএসে বন্ধ হয়েছে ভুয়া অডিট রিপোর্ট

২০২০ সালে আইসিএবি নিজ উদ্যোগে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) চালু করে। সাব্বীর আহমেদের ভাষ্য, ডিভিএস চালুর আগে একই কোম্পানির একাধিক ধরনের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ ছিল। ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কোম্পানির নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি করা হতো।

অনেক ক্ষেত্রে অডিটরের স্বাক্ষর ও সিল জাল করেও প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ডিভিএস চালুর ফলে এ ধরনের জালিয়াতির সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। এখন সিস্টেমে কোম্পানির নাম, অডিটরের নাম ও নিরীক্ষা বছরসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা যায়।

তাঁর মতে, এর ফলে একাধিক অডিট রিপোর্ট তৈরির অনিয়ম কমেছে। এখন আইসিএবির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অডিট রিপোর্টের গুণগত মান ও যথার্থতা নিশ্চিত করা।

অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা

অডিটর ও অডিটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো পেশাতেই সবাই শতভাগ সঠিকভাবে কাজ করে—এমন দাবি করা যায় না। জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুলও হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানির প্রভাবেও অডিটর প্রভাবিত হতে পারেন।

তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা নিয়মের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট অডিটর বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত কয়েক বছরে আইসিএবি বেশ কিছু অডিটর ও অডিট ফার্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাংক অডিটে প্রভিশন ঘাটতি নিয়ে ব্যাখ্যা

ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রভিশন ঘাটতি সঠিকভাবে উপস্থাপন না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সাব্বীর আহমেদ বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ব্যাংকের দেওয়া ঋণ কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শুরুতে নিয়মিত থাকলেও ব্যবসায়িক মন্দা বা অর্থ পাচারের মতো কারণে পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হতে পারে।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গেলে অনেক ব্যাংকের পুঞ্জীভূত সঞ্চিত আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআরএসের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রভিশনিং ঘাটতি সংরক্ষণে ডেফারেল সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করেই অডিটররা নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।

তবে অডিটররা প্রভিশনিংয়ের বিষয়ে যথাযথ ডিসক্লোজার দিয়েছেন কি না, তা আইসিএবি পরীক্ষা করছে। যথাযথ তথ্য প্রকাশ করা হয়ে থাকলে অডিটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

এফআরসি ও আইসিএবি পরিপূরক হতে পারে

সাব্বীর আহমেদ বলেন, অডিট খাতের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্রে এনরন ও ওয়ার্ল্ডকমের মতো প্রতিষ্ঠানের অডিট ব্যর্থতার পর পাবলিক কোম্পানি অ্যাকাউন্টিং ওভারসাইট বোর্ড (পিসিএওবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্যেও গঠিত হয় এফআরসি।

বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ‘রিপোর্ট অন দ্য অবজারভেন্স অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড কোডস—অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং’ (ROSC A&A)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে এফআরসি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জনবলসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

তিনি বলেন, আইসিএবি অডিটরদের নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু কোনো কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা তাদের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার ক্ষমতা আইসিএবির নেই। অন্যদিকে এফআরসি আইন অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর ওপর প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। তাই দুই প্রতিষ্ঠান প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করলে কোনো সমস্যা হবে না।

এফআরসিতে পেশাদার নেতৃত্বের পরামর্শ

এফআরসির চেয়ারম্যান পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা এবং স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে আইসিএবি প্রেসিডেন্ট বলেন, এ পর্যন্ত এফআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সরকারি আমলা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের কারিগরি জ্ঞান থাকলেও বাস্তব পেশাগত অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে এফআরসি প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

তাঁর মতে, এখন এমন একজন পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে চেয়ারম্যান করা উচিত, যাঁর সততা ও পেশাগত দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন নেই এবং যিনি বর্তমানে কোনো পেশা বা অডিট ফার্মের সঙ্গে যুক্ত নন। এতে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি কমবে।

একই সঙ্গে এফআরসিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি আরও আইন ও বিধি প্রণয়ন জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এফআরসিকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন আইসিএবি প্রেসিডেন্ট।

অডিট ফি নির্ধারণের পক্ষে আইসিএবি

ব্যাংকের অডিট ফি নির্ধারণের মতো অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও অডিট ফি নির্ধারণ করা উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সাব্বীর আহমেদ বলেন, দেশের বাস্তবতার বিবেচনায় কোম্পানির অডিট ফি নির্ধারণ করে দেওয়া সমীচীন।

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড না থাকায় অনেক কোম্পানি যথাযথ অডিট ফি দিতে অনীহা দেখায়। একটি নির্ধারিত মানদণ্ড থাকলে এ ধরনের সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

আইসিএবি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, অডিট খাতে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু অডিটরের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং তাঁদের পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও রিপোর্টের গুণগত মান নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ডিভিএসের মাধ্যমে জাল অডিট রিপোর্টের সুযোগ বন্ধ, অনিয়মে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং এফআরসিকে কার্যকর করার মাধ্যমে দেশের আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad